ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল হচ্ছে। ১৯৯১ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত—মাঝখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রায় দুই বছর বাদ দিলে—দীর্ঘ সময় দেশের শাসনভার ছিল দুই শীর্ষ নেত্রীর হাতে।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে সেই দীর্ঘ অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটতে যাচ্ছে।

জাতীয় নির্বাচনের হিসাবে প্রায় ৩৬ বছর পর আবারও একজন পুরুষ প্রধানমন্ত্রী শপথ নিতে যাচ্ছেন, যা দেশের নেতৃত্বের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।

অভ্যুত্থানের পর বদলে যাওয়া সমীকরণ

১৯৯১ থেকে ২০২৪—এই সময়কে রাজনীতিতে ‘দুই নেত্রীর যুগ’ হিসেবেই দেখা হতো। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান সেই ধারাবাহিকতায় ছেদ আনে। আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। তার দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ থাকায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। ফলে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা দলটির নির্বাচনী প্রত্যাবর্তন আপাতত অনিশ্চিত।

সম্প্রতি এক বিদেশি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, শেখ হাসিনা আগেই রাজনীতি থেকে অবসরে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন এবং এটিই তার শেষ মেয়াদ হওয়ার কথা ছিল। ক্ষমতাচ্যুত হওয়াকে তিনি “এক অর্থে শেখ হাসিনা যুগের অবসান” হিসেবে উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে, সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া গত ৩০ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজধানীর একটি হাসপাতালে মারা যান। তার মৃত্যুতে দেশের আরেকটি বড় রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। বর্তমানে বিএনপির নেতৃত্বে রয়েছেন তারেক রহমান।

তারেক রহমান বনাম জোট রাজনীতি

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর শীর্ষ পদে এখন কোনো নারী নেতৃত্ব নেই। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বিএনপি জয়ী হলে তিনিই প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন—এমন প্রত্যাশা দলটির ভেতরে-বাইরে স্পষ্ট। এটি হবে তারেক রহমানের প্রথম জাতীয় নির্বাচন।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গঠিত ১১ দলীয় জোটও নির্বাচনী লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে রয়েছে। এই জোট থেকে সরকারপ্রধান হিসেবে যাকেই মনোনয়ন দেওয়া হোক, তিনিও একজন পুরুষ নেতা হবেন—এমনটাই রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত।

ইতিহাসের ধারাবাহিকতা

১৯৯০ সালে স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। এর আগে ১৯৮৯-১৯৯০ সালে কাজী জাফর আহমদ ছিলেন দেশের সর্বশেষ পুরুষ প্রধানমন্ত্রী। সেই হিসাবে জাতীয় নির্বাচনের ধারায় ৩৬ বছর পর আবারও পুরুষ নেতৃত্বের প্রত্যাবর্তন ঘটছে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হলে প্রধানমন্ত্রী হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৯১-পরবর্তী রাজনীতিতে ক্ষমতা আবর্তিত হয়েছে মূলত খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে।

খালেদা জিয়া দায়িত্ব পালন করেন ১৯৯১-১৯৯৬, ১৯৯৬ সালে স্বল্প সময়ের জন্য এবং ২০০১-২০০৬ পর্যন্ত। শেখ হাসিনা প্রথমবার ক্ষমতায় আসেন ১৯৯৬ সালে; পরে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা চার মেয়াদে দায়িত্ব পালন করে দেশের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

তবে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত ও আলোচিত ছিল। দশম সংসদ নির্বাচনকে বলা হয় ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন’, একাদশকে ‘রাতের ভোটের নির্বাচন’ এবং দ্বাদশকে ‘ডামি ভোটের নির্বাচন’ বলে সমালোচনা রয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ থেকে বর্তমান

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদে দায়িত্বপালনের ধারায় রয়েছেন—

তাজউদ্দীন আহমদ (১১ এপ্রিল ১৯৭১–১২ জানুয়ারি ১৯৭২),

শেখ মুজিবুর রহমান (১২ জানুয়ারি ১৯৭২–২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫),

মুহাম্মদ মনসুর আলী (২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫–১৫ আগস্ট ১৯৭৫),

শাহ আজিজুর রহমান (১৯৭৯–১৯৮২),

আতাউর রহমান খান (১৯৮৪–১৯৮৫),

মিজানুর রহমান চৌধুরী (১৯৮৬–১৯৮৮),

মওদুদ আহমদ (১৯৮৮–১৯৮৯),

কাজী জাফর আহমদ (১৯৮৯–১৯৯০),

বেগম খালেদা জিয়া (১৯৯১–১৯৯৬, ১৯৯৬ স্বল্পকাল, ২০০১–২০০৬),

শেখ হাসিনা (১৯৯৬–২০০১, ২০০৯–২০২৪)।

বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে পরিবর্তন

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মাদ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, “গত তিন দশকে নারী নেতৃত্ব যে দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করেছিল, তা এখন প্রাকৃতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিবর্তনের মুখে। শেখ হাসিনার অনুপস্থিতি এবং খালেদা জিয়ার মৃত্যু—এই দুই প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার কেন্দ্রে পুরুষ নেতৃত্বের অভিষেক এখন সময়ের ব্যাপার।”

দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতৃত্বের কাঠামোতে এই পরিবর্তন কেবল ব্যক্তি-পরিবর্তন নয়; এটি একটি যুগান্তরের প্রতীক হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ফলাফল সেই পরিবর্তনকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেবে।

Share.
Exit mobile version