জেন–জি প্রভাবিত বিশ্বের প্রথম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশে—এমনটাই বলছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থার পর আগামী বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে দেখা যাচ্ছে একেবারেই ভিন্ন রাজনৈতিক চিত্র।
শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকার সময় নির্বাচনের মৌসুমে বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলোকে রাজপথে খুব একটা দেখা যায়নি। কখনো তারা নির্বাচন বর্জন করেছে, কখনো আবার বিরোধী দলের শীর্ষ নেতারা গ্রেপ্তার হওয়ায় কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচনের প্রাক্কালে পরিস্থিতি পুরোপুরি উল্টো।
২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম এখন নিষিদ্ধ। ওই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের অনেকেই বলছেন, ২০০৮ সালের পর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে এটিই হতে যাচ্ছে প্রথম সত্যিকারের প্রতিযোগিতামূলক জাতীয় নির্বাচন।
বিএনপি এগিয়ে, শক্ত অবস্থানে জামায়াত
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জয়ী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোট শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
এ ছাড়া ৩০ বছরের কম বয়সী জেন–জি নেতৃত্বাধীন নতুন রাজনৈতিক দল—জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)—হাসিনাবিরোধী রাজপথের আন্দোলনকে নির্বাচনী শক্তিতে রূপ দিতে ব্যর্থ হয়ে জামায়াতের সঙ্গে জোটে যোগ দিয়েছে।
৩০০ আসনের সংসদে বিএনপি এবারের নির্বাচনে ২৯২টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান রয়টার্সকে বলেছেন, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন পাওয়ার বিষয়ে তাঁর দল আত্মবিশ্বাসী।
অর্থনীতি ও ভূরাজনীতি—দুই দিকেই গুরুত্ব
বিশ্লেষকেরা বলছেন, শেখ হাসিনার পতনের পর কয়েক মাস ধরে দেশজুড়ে অস্থিরতা বিরাজ করছে। এতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতসহ বিভিন্ন শিল্প খাত মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি জনসংখ্যার এই দেশের জন্য ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ফলাফল শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাবশালী দুই দেশ—চীন ও ভারতের ভূমিকা নতুন করে নির্ধারিত হতে পারে।
ঢাকার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, “জনমত জরিপগুলোতে বিএনপি স্পষ্টতই এগিয়ে আছে। তবে মনে রাখতে হবে, ভোটারদের বড় একটি অংশ এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি।”
জেন–জি ভোটারই হতে পারে ‘গেম চেঞ্জার’
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় প্রভাবক হতে পারেন জেন–জি ভোটাররা। মোট ভোটারের প্রায় এক–চতুর্থাংশই ৩০ বছরের কম বয়সী। তাঁদের পছন্দ–অপছন্দই নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।
দেশজুড়ে এখন নির্বাচনী উৎসবের আমেজ। সাদা–কালো পোস্টার, দেয়াললিখন আর ব্যানারে ভরে গেছে শহর ও গ্রাম। সড়কের ধারে ঝুলছে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ ও জামায়াতের ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক। প্রার্থীদের প্রচার কার্যালয়, মিছিল–সমাবেশ আর ভোটের গান চোখে পড়ছে সর্বত্র।
অতীতের নির্বাচনগুলোয় এমন দৃশ্য খুব একটা দেখা যায়নি। তখন আওয়ামী লীগের ‘নৌকা’ প্রতীকের একক আধিপত্যই ছিল দৃশ্যমান।
চীন–ভারত–পাকিস্তান সমীকরণ
রয়টার্স বলছে, শেখ হাসিনাকে ভারতপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করা এবং তাঁর দিল্লিতে আশ্রয় নেওয়ার পর বাংলাদেশে চীনের প্রভাব আরও বেড়েছে। যদিও ভারতের প্রভাব কমছে, তবে অনেক বিশ্লেষকের মতে, জামায়াতের তুলনায় বিএনপির সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্ক বেশি বাস্তবসম্মত হতে পারে।
অন্যদিকে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন সরকার এলে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। জামায়াতের জেন–জি মিত্ররা প্রকাশ্যে ভারতের ‘আধিপত্য’ নিয়ে উদ্বেগের কথা বলছেন এবং সম্প্রতি চীনা কূটনীতিকদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন।
জামায়াতে ইসলামী অবশ্য বলছে, তারা কোনো নির্দিষ্ট দেশের দিকে ঝুঁকবে না; বরং ইসলামিক মূল্যবোধের আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে।
ভোটারদের উদ্বেগ: দুর্নীতি ও মূল্যস্ফীতি
ঢাকাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক অপিনিয়ন স্টাডিজের যৌথ জরিপে দেখা গেছে, দেশের ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ দুর্নীতি। এরপরেই রয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি।
জরিপ বলছে, ভোটারদের কাছে ধর্মীয় বা প্রতীকী ইস্যুর চেয়ে অর্থনীতি, জবাবদিহি ও সুশাসন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নেতৃত্ব নিয়ে প্রত্যাশা
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানকে সম্ভাব্য সরকারপ্রধান হিসেবে এগিয়ে রাখা হচ্ছে। তবে ভোটের ফলাফলে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট এগিয়ে গেলে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানও এই দৌড়ে সামনে চলে আসতে পারেন।
২১ বছর বয়সী প্রথমবারের ভোটার মোহাম্মদ রাকিব বলেন, “আগের সরকার আমলে মানুষ ভোট দিতে পারত না। সাধারণ মানুষের কোনো কণ্ঠস্বর ছিল না।” তাঁর প্রত্যাশা, যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, তারা যেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করে।

