ইরানের পাল্টা হামলার প্রেক্ষাপটে উপসাগরীয় দেশগুলোকে সংহতি জানিয়ে বিশেষ দূতের মাধ্যমে চিঠি পাঠাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান; কাতারের পর এবার সংযুক্ত আরব আমিরাত ওমানের সরকারপ্রধানের কাছে গেল তার চিঠি।

বুধবার আরব আমিরাত ও ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ওই চিঠি হস্তান্তর করেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব চিঠি পাঠানোর তথ্য দিয়ে বলা হয়েছে, “প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা বর্তমানে উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশ সফর করছেন, যার লক্ষ্য সংশ্লিষ্ট দেশের নেতৃত্বের কাছে প্রধানমন্ত্রীর বার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং এ অঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা আরও সুদৃঢ় করা।”

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। ওই হামলায় চার দেশে অন্তত ছয়জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।

ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলোর বিভিন্ন স্থাপনা আক্রান্ত হওয়ার মধ্যে ইরান দাবি করে আসছে, শুধু ওই দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটি এবং স্বার্থ সংশ্লিষ্ট স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করছে তারা।

ইরানে হামলা, পাল্টা হামলার প্রেক্ষাপটে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দুই দফায় যে বিবৃতি দিয়েছে, সেটা ঢাকার আগের অবস্থানের বিপরীত। এর আগে ইরানে প্রায় সব ইসরায়েলি হামলার ঘটনায় বিবৃতি দিয়ে নিন্দা জানাত বাংলাদেশ।

পহেলা মার্চ দেওয়া প্রথম বিবৃতিতে ইরানে যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত হামলার কোনো নিন্দা জানায়নি ঢাকা। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর কথাও বিবৃতিতে ছিল না।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের ‘সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে’ যে নিন্দা ঢাকা জানিয়েছে, তাতে সাতটি দেশের নাম থাকলেও বাদ রাখা হয় ইরানকে।

বাংলাদেশ সরকারের ওই বিবৃতি যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্সসহ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের আক্রান্ত দেশগুলোর সঙ্গে মেলে।

সরকারের ওই বিবৃতি নিয়ে সমালোচনার মধ্যে পরদিন আরেক বিবৃতিতে আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুতে ‘মর্মাহত’ হওয়ার কথা বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

বিবৃতিতে ‘আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে টার্গেটেড হামলায় এই হত্যাকাণ্ড’ ঘটানোর কথা বলা হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নাম নেয়নি ঢাকা।

কূটনৈতিক উপায়ে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়ে বাংলাদেশ সরকার বলে আসছে, মধ্যপ্রাচ্যে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থই ঢাকার অগ্রাধিকার।

আরব আমিরাত

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বুধবার সন্ধ্যায় আরব আমিরাতের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন উপদেষ্টা হুমায়ুন। ওই সাক্ষাতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান বরাবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের লেখা ব্যক্তিগত পত্র হস্তান্তর করেন তিনি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পত্রে প্রধানমন্ত্রী চলমান সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতৃত্ব, সরকার এবং ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণের প্রতি বাংলাদেশের দৃঢ় সংহতি ব্যক্ত করেন।

“তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতে সাম্প্রতিক হামলা, প্রাণহানি, আহতের ঘটনা এবং সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।”

একইসঙ্গে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসীর নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণও জানিয়েছেন তিনি।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠককালে আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই যুদ্ধে তাদের দেশে ইরানের হামলায় দুইজন বাংলাদেশি নিহত হওয়ায় তার সরকারের গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, তাদের সরকার সেদেশে অবস্থিত সব মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বদ্ধ পরিকর।

তিনি এই যুদ্ধকালীন সময়ে বাংলাদেশের সমর্থনের জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

এসময় পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা আরব আমিরাতের নেতৃত্বের প্রশংসা করেন এবং সংলাপ ও কূটনৈতিক উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির গুরুত্ব তুলে ধরেন।

ওমান

একই দিন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ বদর বিন হামাদ বিন হামুদ আল-বুসাইদীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিককে লেখা একটি ব্যক্তিগত চিঠি হস্তান্তর করেন।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী বর্তমান আঞ্চলিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ওমানের নেতৃত্ব, সরকার এবং ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণের প্রতি বাংলাদেশের সংহতি প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী ওমানের ওপর হামলা এবং প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।”

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ওমানে থাকা বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশির নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে নেওয়া পদক্ষেপের জন্য ওমান সরকারের অব্যাহত সমর্থনের প্রতি তিনি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী ওমান সরকারের যেকোন প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বিরোধ নিষ্পত্তিতে মধ্যস্থতা এবং এই অঞ্চলে শান্তি, সংলাপ ও কূটনীতি প্রসারে ওমানের গঠনমূলক ভূমিকার প্রশংসা করেন।

আলোচনায় বাংলাদেশ ও ওমানের মধ্যকার চমৎকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয়টি উঠে আসার কথা বলা হয় বিজ্ঞপ্তিতে।

Share.
Exit mobile version