রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ছয়টি গ্রামে শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ কেড়ে নিয়েছে পদ্মায় নৌকাডুবির এক মর্মান্তিক ঘটনা। তিনজনের মৃত্যুর শোকে এসব গ্রামের পূজামণ্ডপগুলোতে উৎসবের পরিবর্তে বিরাজ করছে বিষাদের ছায়া। জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন বাদ দিয়ে পূজা এখন কেবল নিয়ম রক্ষার আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে।

সোমবার সকালে উপজেলার প্রেমতলী দুর্গামাতা ও কালীমাতা মন্দিরে গিয়ে এই শোকাবহ পরিবেশের চিত্র দেখা যায়। মণ্ডপ ছিল পূজারিদের উপস্থিতি শূন্য। নওগাঁর মান্দা থেকে ১৭ হাজার টাকায় আসা ঢুলি শ্যামল চন্দ্র পাল ও দীপক চন্দ্র পাল ঢাক নিয়ে বসে থাকলেও তাতে কাঠি পড়েনি। মন্দির কমিটির সভাপতি মোহন কুমার পাল জানান, প্রতিবছর শতাধিক পরিবার পূজা করতে এলেও ষষ্ঠীর দিন হাতে গোনা কয়েকজন এসেছিলেন। সপ্তমীর দিন সকালে তো পুরোহিত আর নাপিত ছাড়া কেউই ছিলেন না।

মন্দির কমিটির তথ্য ও প্রযুক্তি সম্পাদক অর্ক কুমার পাল বলেন, “১৯৮৭ সাল থেকে এখানে পূজা হচ্ছে। এমন করুণ পরিস্থিতি আগে কখনো হয়নি। এবার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গান-বাজনা সব বন্ধ রাখা হয়েছে।”

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার প্রেমতলী পালপাড়া এলাকার কানাই কর্মকার (৭০) বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যান। তার মরদেহ সৎকারের জন্য প্রায় ২০-২৫ জন একটি নৌকায় করে পদ্মা নদীর মাঝখানের একটি চরের দিকে যাচ্ছিলেন। স্রোতের কারণে নৌকাটি ডুবে গেলে এই দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর প্রথমে জিতেন মণ্ডলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন দিলীপ দাস ও হরেন সাহার মরদেহ ভেসে ওঠে। এই তিনজনের মৃত্যুতে প্রেমতলী, খেতুর, ডুমুরিয়া, পালপাড়া, কাঁঠালবাড়িয়া ও ফরাদপুর গ্রামে শোক নেমে আসে।

এই দুর্ঘটনার কারণে পুরো এলাকার হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকলেই শোকাহত। মন্দিরের নিরাপত্তায় থাকা আনসার সদস্য ইসমাইল হোসেন বলেন, “এতগুলো মানুষের মৃত্যুর পর কোনো উৎসব থাকে না। তাই কারও মনে আনন্দ নেই।” মন্দিরের সামনের এক দোকানি রাজকুমারী পাল বলেন, “একই এলাকায় পাঁচজনের মৃত্যুর পর কি আর আনন্দ থাকে? কবরস্থানটা নদীর এপারে থাকলে এই দুর্ঘটনা ঘটত না।”

গ্রামবাসীরা জানান, প্রায় ২০ বছর ধরে নদীর মাঝখানে জেগে ওঠা একটি চরকেই তারা মরদেহ সৎকারের স্থান হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফয়সাল আহমেদ জানিয়েছেন, তিনি বিষয়টি নিয়ে ভাবছেন এবং গ্রামবাসীকে গ্রামের ভেতরে একটি সমাধিস্থলের জন্য আবেদন করতে বলেছেন।

Share.
Exit mobile version