কারাবন্দি বাগেরহাটের ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল হাসান সাদ্দামকে স্ত্রী-সন্তানের জানাজা ও দাফনে যেতে না দেওয়াকে সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে সরকারের যে নীতিমালা রয়েছে সাদ্দামের ক্ষেত্রে সেটিও প্রতিপালিত হয়নি বলে মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।
রোববার আসক এক সংবাদ বিবৃতিতে বলেছে, “সাদ্দামকে তার মৃত স্ত্রী ও ৯ মাস বয়সী শিশুসন্তানের জানাজা ও দাফনে অংশগ্রহণের জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে যথাযথ কর্তৃপক্ষ বরাবর আনুষ্ঠানিক আবেদন জানানো সত্ত্বেও প্যারোলে মুক্তি না দিয়ে কেবল কারাফটকে মরদেহ দেখানোর ঘটনাকে আসক সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে মনে করছে।”
জুয়েল হাসান সাদ্দাম নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের বাগেরহাট সদর উপজেলা শাখার সভাপতি। তিনি ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের সময়কার একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে যশোর জেলা কারাগারে আছেন।
শুক্রবার বিকালে উপজেলার কাড়াপাড়া ইউনিয়নের সাবেকডাঙা গ্রাম থেকে তার স্ত্রী সুবর্ণা স্বর্ণালী (২২) এবং তাদের নয় মাস বয়সী ছেলে নাজিফের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, তারা সুবর্ণা স্বর্ণালীকে ঘরের ফ্যানের সঙ্গে রশি দিয়ে ঝুলে থাকা অবস্থায় এবং ছেলেকে মেঝে থেকে উদ্ধার করেছেন।
তবে স্ত্রী-সন্তানের লাশ উদ্ধারের খবর পেলেও কারাগার থেকে মুক্তি পাননি সাদ্দাম।
এ অবস্থায় শনিবার সন্ধ্যায় সাদ্দামের সন্তান ও স্ত্রীর লাশ নেওয়া হয় যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে। সেখানে তাদের শেষবারের মত ছুয়ে দেখেন তিনি। এরপর আবার তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
আসক বলেছে, “বাংলাদেশ সংবিধানের-অনুচ্ছেদ ২৭ অনুযায়ী সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং সমান আইনি সুরক্ষার অধিকারী; অনুচ্ছেদ ৩১ নাগরিককে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার প্রদান করে; ৩৫(৫) অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর দণ্ড বা আচরণের শিকার করা যাবে না।”
সাদ্দামকে প্যারোলের সুযোগ না দেওয়া সংবিধানের ব্যত্যয় মন্তব্য করে আসকের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, একজন বিচারাধীন বন্দি হিসেবে সাদ্দাম এসব সাংবিধানিক সুরক্ষার বাইরের নন। অথচ তার স্ত্রী ও শিশুসন্তানের মৃত্যুজনিত চরম মানবিক পরিস্থিতিতে পরিবারের আবেদন থাকা সত্ত্বেও প্যারোলে মুক্তি না দেওয়া এবং জানাজা ও দাফনে অংশগ্রহণের সুযোগ অস্বীকার করা কার্যত তাকে অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণের শিকার করেছে, যা সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদের সরাসরি ব্যত্যয়।
প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে সরকারের যে নীতিমালাটি রয়েছে সাদ্দামের ক্ষেত্রে সেটিও প্রতিপালিত হয়নি তুলে ধরা হয় বিবৃতিতে।
প্যারোলে মুক্তি বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালের ০১ জুন একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে।
এই বিষয়টি মনে করিয়ে দিয়ে আসক বলেছে, “নীতিমালায় বলা হয়েছে-ভিআইপি বা অন্যান্য সকল শ্রেণির কয়েদি বা হাজতি বন্দিদের নিকটাত্মীয়ের যেমন বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি, স্বামী-স্ত্রী, সন্তানসন্ততি এবং আপন ভাই-বোন মারা গেলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া যাবে।
“এই নীতিমালা প্রশাসনিক বিবেচনার বিষয় হলেও তা ইচ্ছামতো, নির্বিচারে বা কোনো যুক্তি প্রকাশ না করে প্রত্যাখ্যানযোগ্য নয়। এই ক্ষেত্রে পরিবার কর্তৃক আবেদন জানানো সত্ত্বেও উক্ত বিধান প্রয়োগ না করা আইনের উদ্দেশ্য ও ন্যায্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পরিপন্থী বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।”
ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দামের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনেরও লঙ্ঘন হয়েছে তুরে ধরে বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ যে আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (আইসিসিপিআর) এর রাষ্ট্রপক্ষ, তার অনুচ্ছেদ ৭–এ নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে; অনুচ্ছেদ ১০(১) এ বলা হয়েছে, স্বাধীনতাবঞ্চিত সকল ব্যক্তির সঙ্গে মানবিকতা ও মর্যাদার সঙ্গে আচরণ করতে হবে।
“কারাফটকে পাঁচ মিনিটের জন্য মৃত স্ত্রী ও শিশুসন্তানের মুখ দেখিয়ে একজন শোকাহত বন্দিকে জানাজা ও দাফনে অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত করা আইসিসিপিআর এর উল্লিখিত ধারাসমূহের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ।”

