সরকারি চাকরিজীবিদের সর্বনিম্ন মূল বেতন হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন স্কেল ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করেছে নবম জাতীয় বেতন কমিশন।

কমিশন বর্তমানের মতোই সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২০টি স্কেলে বেতন সুপারিশ করেছে।

বুধবার প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে কমিশন তাদের প্রতিবেদন হস্তান্তর করেছে বলে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর জানিয়েছে।

কমিশনের বরাতে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর বলেছে, সুপারিশ অনুযায়ী পুরো পরিমাণ বেতন বাড়ানো হলে বাড়তি এক লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে।

এদিন বিকালে বেতন কমিশনের প্রধান জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের কমিশন প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন। এসময় কমিশনপ্রধান বলেন, প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে এক লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে।

বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের ব্যয় হচ্ছে এক লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।

প্রতিবেদন হস্তান্তর অনুষ্ঠানে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী, অর্থ সচিব খায়রুজ্জামান মজুমদারসহ কমিশনের সব সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

প্রতিবেদন হস্তান্তরের সময় অর্থ উপদেষ্টা বলেন, এই প্রস্তাব বাস্তবায়নই এখন পরবর্তী কাজ। এ লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করে দেওয়া হবে, যে কমিটি বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করবে।

গত ২৭ জুলাই সরকার ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে এবং ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করে। পরে সময় বাড়িয়ে এর জন্য আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করা হয়। সে হিসেবে তিন সপ্তাহ আগে প্রতিবেদন জমা দিল কমিশন।

২০১৩ সালে অষ্টম বেতন কমিশন গঠনের পর দীর্ঘ ১২ বছর পর এই কমিশন গঠিত হয়।

প্রতিবেদন হস্তান্তরের পর প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রধান উপদেষ্টা প্রতিবেদন গ্রহণ সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং কমিশনের সদস্যদের ধন্যবাদ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “এটি একটি মস্ত বড় কাজ। মানুষ বহুদিন ধরে এর জন্য অপেক্ষা করছে। আউটলাইন দেখে বুঝলাম, এটি খুবই সৃজনশীল কাজ হয়েছে।”

এসময় কমিশনপ্রধান বলেন, গত এক দশকে বৈশ্বিক ও জাতীয় পর্যায়ে অর্থনীতির প্রায় সকল সূচকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বহুগুণ বেড়েছে। সময়োপযোগী ও যথাযথ বেতন কাঠামো নির্ধারণ না হওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সুস্পষ্ট কার্যপরিধি নির্ধারণপূর্বক বিদ্যমান বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে কমিশন কাজ করে।

প্রতিবেদন তৈরি করতে কমিশন বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে অনলাইন ও অফলাইনে ১৮৪টি সভা করে এবং ২৫৫২ জনের মতামত ও প্রস্তাব গ্রহণ করে। পাশাপাশি বিভিন্ন সমিতি ও সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করে।

কমিশনের প্রতিবেদনে নতুন প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে- সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা প্রবর্তন, পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার, সরকারি কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড পুনর্গঠন, সার্ভিস কমিশন গঠন, বেতন গ্রেড ও স্কেলের যৌক্তিক পুনর্বিন্যাস, সরকারি দপ্তরগুলোর ভাতা পর্যালোচনার জন্য কমিটি গঠন এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে মানবসম্পদ উন্নয়ন।

কোন গ্রেডে কত বাড়ানোর প্রস্তাব?

নতুন বেতন কাঠামোতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতনের মধ্যে ১:৮ অনুপাতে পার্থক্য রাখা হয়েছে। বর্তমানে যা ১:৯.০৭৬। এর আগের বেতনকাঠামোতেও একই অনুপাত রেখেছিল কমিশনগুলো। সে হিসাবে এবার খানিকটা পার্থক্য ঘুচল।

এছাড়া সব পর্যায়ে দ্বিগুণ থেকে আড়াইগুণের মতো মূল বেতন বাড়ানো হয়েছে নতুন বেতনকাঠামোতে। এর ফলে সর্বনিম্ন গ্রেডে বাড়ি ভাড়াসহ মূল বেতনের সঙ্গে সব ভাতা যোগ করে দাঁড়াবে ৪১ হাজার ৯০৮ টাকা।

গ্রেড ১: ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

গ্রেড ২: ৬৬,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা।

গ্রেড ৩: ৫৬,৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ১৩ হাজার টাকা।

গ্রেড ৪: ৫০,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা।

গ্রেড ৫: ৪৩,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮৬ হাজার টাকা।

গ্রেড ৬: ৩৫,৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭১ হাজার টাকা।

গ্রেড ৭: ২৯,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫৮ হাজার টাকা।

গ্রেড ৮: ২৩,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৭ হাজার ২০০ টাকা।

গ্রেড ৯: ২২,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৫ হাজার ১০০ টাকা।

গ্রেড ১০: ১৬,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩২ হাজার টাকা।

গ্রেড ১১: ১২,৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা।

গ্রেড ১২: ১১,৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৪ হাজার ৩০০ টাকা।

গ্রেড ১৩: ১১,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৪ হাজার টাকা।

গ্রেড ১৪: ১০,২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৩ হাজার ৫০০ টাকা।

গ্রেড ১৫: ৯,৭০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২২ হাজার ৮০০ টাকা।

গ্রেড ১৬: ৯,৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২১ হাজার ৯০০ টাকা।

গ্রেড ১৭: ৯,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২১ হাজার ৪০০ টাকা।

গ্রেড ১৮: ৮,৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২১ হাজার টাকা।

গ্রেড ১৯: ৮,৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার ৫০০ টাকা।

গ্রেড ২০: ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা।

Share.
Exit mobile version