আগামী পাঁচ বছরের জন্য দেশকে কে নেতৃত্ব দেবে, তা নির্ধারণের শেষ মুহূর্তে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের প্রায় পৌনে ১৩ কোটি ভোটার।

আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা বাজতেই খুলে যাবে দেশের প্রায় ৪২ হাজার ভোটকেন্দ্রের দরজা।

সংসদ ও গণভোট একসঙ্গে করায় অন্যবারের চেয়ে এবার ভোট নেওয়ার সময় এক ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে।

ভোটের কেন্দ্রবিন্দু এবার শুধু সংসদ নয়; দেশের মানুষকে নির্ধারণ করতে হবে রাষ্ট্র সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো—জুলাই জাতীয় সনদের ভবিষ্যৎও তাদের হাতে।

সংসদের ভোটের ব্যালট হবে সাদাকালো; গণভোটেরটি গোলাপী। এবার ৫০টি দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলে ভোটে লড়ছেন ২ হাজার ২৮ জন। প্রথমবারের মতো এ নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন প্রবাসীরা।

ভোটের আগের দিন জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন বলেছেন, “আগামীকাল ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনে ভোট দেওয়াটা কেবল নাগরিক অধিকারই নয়, দায়িত্বও।”

একনজরে ভোট

>> পৌনে ১৩ কোটি ভোটারের এ নির্বাচনে থাকছে ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্র, যাতে থাকবে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি ভোটকক্ষ।

>> ২৯৯ আসনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের ক্ষেত্রে ভোটকেন্দ্রের গুরুত্ব বিবেচনায় প্রতিটি কেন্দ্রে ১৬ থেকে ১৮ জন নিরাপত্তা সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।

এবার প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২৫ হাজার ৭০০টি কেন্দ্রে পুলিশের জন্য ‘বডি ওর্ন ক্যামেরা’ থাকছে।

‘নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপ’ ব্যবহার হচ্ছে ভোটের জন্য। অ্যাপটি কেবল নির্বাচনি দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ব্যবহার করবেন।

কোনো ভোটকেন্দ্রে বা আশপাশে সহিংসতা বা গোলযোগ হলে অ্যাপের মাধ্যমে দ্রুত সংশ্লিষ্ট বাহিনী, রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং কেন্দ্রীয়ভাবে নির্বাচন কমিশনের কাছে বার্তা পৌঁছে যাবে।

নির্বাচনে প্রায় সাড়ে ৯ লাখের কাছাকাছি নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন থাকছে। এর মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য রয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার। ইতোমধ্যে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর ১ লাখ ৮ হাজার ৮৮৫ জন সদস্য মোতায়েন করা রয়েছে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৩৭ হাজার ৪৫৩ জন সদস্য এক হাজার ২১০টি প্লাটুনে মোতায়েন করা হয়েছে।

কোস্ট গার্ড দায়িত্ব পালন করছে ১০টি জেলার ৬৯টি ইউনিয়নে। ১৭টি আসনে দায়িত্ব পালন করা কোস্ট গার্ডের সদস্য সংখ্যা ৩ হাজার ৫৮৫।

পুলিশের ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন সদস্য এবং আনসারের ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৮ জন সদস্য মোতায়েন রয়েছে। র্যাবের ৯ হাজার ৩৪৯ জন এবং বিএনসিসির এক হাজার ৯২২ জন সদস্য মোতায়েন থাকছে।

নির্বাচনে ৮০টি দেশি নিবন্ধিত সংস্থার মোট ৪৫ হাজার পর্যবেক্ষক দায়িত্ব পালন করবেন। বিদেশি পর্যবেক্ষক থাকবেন প্রায় ৫০০ জন।

নির্বাচনে প্রায় ৮ লাখ কর্মকর্তা নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তা আছেন ৬৯ জন, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ৫৯৮ জন, প্রিজাইডিং অফিসার ৪২ হাজার ৭৭৯ জন, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ জন এবং পোলিং অফিসার থাকবেন ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯৬৪ জন।

এর পাশাপাশি ২৯৯ আসনে পোস্টাল ভোটের দায়িত্বে থাকবেন ৫ হাজার ৮৯৬ জন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা।

কেন্দ্র থেকে কেন্দ্রীয় ফল যেভাবে

ভোটের দিন নির্বাচনের অগ্রগতি প্রতিবেদন আগের মতোই দুই ঘন্টা পর পর দেবে নির্বাচন কমিশন।

নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, কেন্দ্র থেকে ভোটের ফল জানানো হবে, এরপর রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় ও পরে নির্বাচন কমিশনে ফল দেওয়া হবে। সংসদ ও গণভোটের ফল একসঙ্গে দেওয়া হবে। কেন্দ্রেও ভোট গণনা একসাথে হবে, ফলও একসঙ্গে।

দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ভোট হবে ২৯৯ আসনে। প্রার্থীর মৃত্যুতে শেরপুর-৩ আসনের ভোট পরে হবে।

গণভোটের ইতিবৃত্ত

রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে জনগণের মতামত নেওয়ার পদ্ধতিই হল গণভোট।

>> স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালে তিনবার গণভোট হয়েছে।

>> ১৯৭৭ সালের ৩০ মে প্রথম গণভোট হয়েছিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং তার অনুসৃত নীতি ও কর্মপন্থার প্রতি জনগণের মতামত যাচাইয়ের জন্য। প্রদত্ত ভোটের ৯৮.৮% ‘হ্যাঁ’ ভোট; ১.১২% ‘না’ ভোট পড়েছিল।

>> ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ দেশে দ্বিতীয়বার গণভোট হয় তখনকার রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অনুসৃত নীতি ও কর্মপন্থার প্রতি আস্থা এবং স্থগিত সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠান পর্যন্ত তার রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত থাকার বিষয়ে জনগণের সিদ্ধান্ত জানতে। মূলত সামরিক শাসকের বৈধতা দেওয়ার জন্য সেই গণভোট হয়েছিল। প্রদত্ত ভোটের ৯৪.১১% ‘হ্যাঁ’ এবং ৫.৫০% ‘না’ ভোট পড়েছিল সেবার।

>> ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ১৪২ (১ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তৃতীয়বার গণভোট হয়। এ গণভোট ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের সামনে প্রশ্ন ছিল- ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান (দ্বাদশ সংশোধন) বিল, ১৯৯১-এ রাষ্ট্রপতির সম্মতি দেওয়া উচিত কি না?’ ভবিষ্যতে দেশে কোন ধরনের সরকার পদ্ধতি চলবে, জনগণের কাছে তা জানতে চাওয়া হয়েছিল এ প্রশ্নের মাধ্যমে। সেবার ৮৪% ‘হ্যাঁ’ ভোট এবং ১৫.৬২% ‘না’ ভোট পড়েছিল।

Share.
Exit mobile version