দেশের কর-জিডিপি অনুপাত কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নীত করা এবং সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অভ্যন্তরীণ ও বহিঃবাণিজ্য সহায়ক করনীতি প্রণয়নের লক্ষ্যে গঠিত জাতীয় কর কাঠামো পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত কমিটি মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাটের একক হারের দিকে ‘অগ্রসর হওয়ার’ সুপারিশ করেছে।

এই প্রতিবেদনে মোট ৫৫টি নীতিগত বিষয় চিহ্নিত করে সেগুলোর জন্য সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অগ্রাধিকারভিত্তিক সাতটি নীতিগত বিষয় রয়েছে।

মঙ্গলবার বিকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) বাংলাদেশ এর চেয়ারম্যান জায়েদী সাত্তারের নেতৃত্বে কমিটির সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন হস্তান্তর করেছেন।

কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ রাজস্ব আদায় এবং কর–জিডিপি অনুপাত গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে উন্নীত করার লক্ষ্যে গত ৬ অক্টোবর জায়েদী সাত্তারের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের জাতীয় কর কাঠামো পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত কমিটি গঠন করে সরকার।

কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন-সুলতান হাফিজ রহমান, সৈয়দ মইনুল আহসান, মোহাম্মদ জাহিদ হোসাইন, খুরশীদ আলম, মাহতাব উদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, মুহাম্মদ মেহেদী হাসান, শাহ মো. আব্দুল খালেক, স্নেহাশীষ বড়ুয়া এবং সদস্য সচিব মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান পাটওয়ারী।

কমিটিকে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে করণীয় বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সুপারিশসহ চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বলা হয়।

তবে চারদিন আগেই মঙ্গলবার বিকাল ৫টায় ‘ট্যাক্স পলিসি ফর ডেভেলপমেন্ট: আ রিফর্ম এজেন্ডা ফর রিস্ট্রাকচারিং দ্য ট্যাক্স সিস্টেম’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করা হল।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কর ব্যবস্থাকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল, অদক্ষ এবং পরোক্ষ করের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল বলে তুলে ধরা হয়েছে।

এতে বলা হয়, “সামান্য সংস্কার বা খণ্ডিত পরিবর্তনের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে কর ব্যবস্থার মৌলিক ও কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।”

প্রতিবেদনে ২০৩০ সালের মধ্যে কর–জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশে উন্নীত করার রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কাঠামোগত পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের অনুপাত বর্তমান ৩০:৭০ থেকে ৫০:৫০ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এছাড়া ডিজিটালাইজেশন, অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ, সহজ কর কাঠামো, প্রণোদনা পুনর্গঠন, ঝুঁকিভিত্তিক অডিট এবং বাণিজ্য কর থেকে সরে এসে দেশীয় করের দিকে কৌশলগত পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে।

শুল্ক কাঠামো আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে রপ্তানি ও আমদানির বিকল্প পণ্যের কার্যকর সুরক্ষা সমান করার পরামর্শও দেওয়া হয়।

প্রতিবেদনে পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে আলাদা ‘ভ্যালুয়েশন ডেটাবেজের’ প্রয়োজন নেই তুলে ধরে বন্দরের পরিবর্তে পণ্য ছাড়ের পর নিরীক্ষার সুপারিশ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থায় বহু হারের পরিবর্তে একক হারের দিকে অগ্রসর হওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

প্রতিবেদন গ্রহণ শেষে কমিটির সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হাতে সময় খুবই কম। আমরা এসব নীতির বাস্তবায়নের পথচলা শুরু করে যেতে চাই।”

তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, “এই নীতিগুলো বাস্তবায়িত হলে রাজস্ব আদায়ের খাত ও পদ্ধতি আরও স্পষ্ট হবে এবং এটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় একটি বড় নীতিগত পরিবর্তন আনবে।”

অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “এই প্রতিবেদন আমাদের জন্য একটি গাইডলাইন হিসেবে কাজ করবে। এর ফলে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির পাশাপাশি এ খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।”

Share.
Exit mobile version