বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার মধ্যে সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেট্রল ও ডিজেলের ওপর আবগারি শুল্ক কমিয়েছে ভারত সরকার। একই সঙ্গে জ্বালানি রপ্তানিতে নতুন করে কর আরোপ করেছে দেশটি, যাতে অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা যায়।
ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে জানিয়েছে, পেট্রলের আবগারি শুল্ক লিটারপ্রতি ১৩ রুপি থেকে কমিয়ে ৩ রুপি করা হয়েছে। পাশাপাশি ডিজেলের ওপর শুল্ক ১০ রুপি থেকে সরাসরি শূন্যে নামিয়ে আনা হয়েছে।
সরকারের এই সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এলো, যখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। ভারতের প্রায় ৪০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এই প্রণালির মাধ্যমে আমদানি হয়, ফলে দেশটি সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়ে।
রাজস্বে বড় ধাক্কার আশঙ্কা
শুল্ক কমানোর ফলে সরকারের রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। যদিও সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ জানায়নি, তবে বেসরকারি বিশ্লেষকদের মতে, বছরে প্রায় ১ দশমিক ৫৫ ট্রিলিয়ন রুপি পর্যন্ত রাজস্ব ক্ষতি হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পদক্ষেপ তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর ওপর চাপ কমাবে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে গিয়ে কোম্পানিগুলো প্রতি লিটার পেট্রলে প্রায় ২৪ রুপি এবং ডিজেলে প্রায় ৩০ রুপি পর্যন্ত ক্ষতির মুখে পড়ছে।
তেলমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, এই ক্ষতি কমাতেই সরকার বড় ধরনের রাজস্ব ছাড় দিয়েছে।
নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক গুরুত্ব
এই সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক হিসাবও রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, আগামী মাসে চারটি রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ভারতে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ভোটারদের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে, ফলে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার আগেভাগেই পদক্ষেপ নিয়েছে।
জ্বালানি রপ্তানিতে কর আরোপ
শুল্ক কমানোর পাশাপাশি সরকার ডিজেল ও বিমান জ্বালানি রপ্তানিতে কর আরোপ করেছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ডিজেল রপ্তানিতে লিটারপ্রতি ২১ দশমিক ৫ রুপি এবং বিমান জ্বালানিতে ২৯ দশমিক ৫ রুপি কর দিতে হবে।
সরকারের এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা। গত বছরের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ভারত প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ মেট্রিক টন পেট্রল এবং ২ কোটি ৩৬ লাখ টন ডিজেল রপ্তানি করেছে। বর্তমানে পরিস্থিতির কারণে বেশিরভাগ রিফাইনারি রপ্তানি কার্যক্রম সীমিত করেছে।
সরবরাহ নিশ্চিতে সরকারের আশ্বাস
অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ বলেছেন, পেট্রল, ডিজেল ও জেট ফুয়েলের সরবরাহে কোনো ঘাটতি হবে না—সরকার তা নিশ্চিত করবে। তিনি জানান, তেল বিপণন কোম্পানিগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে, যাতে সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ না পড়ে।
এদিকে শিল্প ও বাণিজ্য খাতে তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সরবরাহ ২০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে করে মোট সরবরাহ সংকট-পূর্ব সময়ের প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছাবে বলে আশা করছে সরকার।
বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে ভারতের এই পদক্ষেপ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রয়টার্স


