আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের সদস্যের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছেন সাবেক প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
তাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় লিখিত এই বিবৃতি মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো হয়।
নবনির্বাচিত সরকার সোমবার তাজুল ইসলামকে সরিয়ে মো. আমিনুল ইসলামকে প্রধান কৌঁসুলির দায়িত্ব দেয়।
একইদিন প্রসিকিউশনের সদস্য বি এম সুলতান মাহমুদ আরেক প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হোসাইন তামিমের বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বক্তব্য দেন।
বিষয়টি নিয়ে ওইদিনই সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েন মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, এবং যথারীতি তা অস্বীকারও করেন। এ নিয়ে সারাদেশে আলোচনার মধ্যে মঙ্গলবার তিনি লিখিত বিবৃতি দিলেন।
তাজুল ইসলাম সেখানে বলেন, “গতকাল এবং আজ কিছু সংখ্যক গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমে আমার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের জনৈক প্রসিকিউটরের বরাতে কিছু বিদ্বেষপ্রসূত ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হয়েছে।
“এ ব্যাপারে আমার সুস্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে- উক্ত বক্তব্যসমূহ জঘন্য মিথ্যাচার, তথ্য প্রমাণবিহীন এবং আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার দুরভিসন্ধি থেকে করা হয়েছে।”
ওই অভিযোগকে ‘বিদ্বেষপ্রসূত, সর্বতোভাবে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’ দাবি করে তিনি বলেন, “আমি চ্যালেঞ্জ করছি, আমার (বিরুদ্ধে) আনীত এসব অভিযোগের সপক্ষে সামান্য তথ্য প্রমাণও কেউ দেখাতে পারবে না। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে আমি এবং প্রসিকিউশন টিমের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল স্বচ্ছ এবং আইনানুগ।”
তাজুল ইসলাম বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের আইনজীবী হিসেবে আইনি লড়াইয়ে যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
গত ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার এই ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে। এর অংশ হিসেবে প্রধান কৌঁসুলির দায়িত্ব পান তাজুল ইসলাম।
কাজী মোস্তাফিজুর রহমান আহাদ নামের এক ব্যক্তি সোমবার সকালে ‘ট্রাইব্যুনালে সেটলিং বাণিজ্য ও রাজসাক্ষী নাটক: কেন সরতে হচ্ছে তাজুল ইসলামকে?’ শিরোনামে ফেইসবুকে একটি পোস্ট দেন। সেখানে দুই মন্তব্যে কৌঁসুলি সুলতান মাহমুদ অভিযোগের বিষয়গুলো সামনে আনেন।
সুলতান মাহমুদ তার মন্তব্যে লেখেন, “গত বছর নভেম্বরের শেষ দিকে আশুলিয়ার লাশ পোড়ানো মামলার আসামি আফজালের (এসআই শেখ আবজালুল হক; তিনি এ মামলায় রাজসাক্ষী হয়ে আদালতের ক্ষমা পান) বউ সন্ধ্যার দিকে ভারী ব্যাগ নিয়ে তামিমের (গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম) রুমে প্রবেশ করে। বিষয়টি আমরা দেখার পরে সঙ্গে সঙ্গে তাজুল ইসলামের (সাবেক প্রধান কৌঁসুলি) রুমে গিয়ে তাকে জানাই।
“এই ঘটনায় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, বরং উল্টো আমাদের বকাঝকা করে। তামিম তখন সবার সামনে স্বীকার গিয়েছিল হ্যাঁ আফজালের বউ তার রুমে এসেছিল। চিফ প্রসিকিউটর শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন আসামির বউ কেন তার রুমে গিয়েছিল। শুধু এই জিজ্ঞাসা করা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে সেই আফজালকে রাজসাক্ষী করা হলো। চূড়ান্ত বিচারে তাকে খালাস দেয়া হলো।”
আরও কয়েকটি মামলার সাক্ষীর বিষয়েও অভিযোগ তোলেন বি এম সুলতান মাহমুদ।
তিনি লেখেন, “চানখারপুলের মামলায় এসআই আশরাফুল গুলি করার নির্দেশনা দিচ্ছে–এরকম ভিডিও প্রকাশ পাওয়ার পরেও তাকে আসামি না করে সাক্ষী করা হয়েছে। সেই ভিডিও আমার কাছে আছে। কারো লাগলে দেখতে পারবেন আমার কাছ থেকে নিয়ে।
“রংপুরের আবু সায়ীদের মামলায় এসি ইমরানকে কেন অব্যাহতি দেওয়া হলো? এই ইমরানের নাম কয়েকজন সাক্ষীরা আদালতে এসে বলেছে।
“সাবেক আইজি আব্দুল্লাহ আল মামুনকে কী কারণে রাজসাক্ষী করা হলো? এই আইজি মামুনের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় শতশত মায়ের বুক খালি করেছে তার পোষ্য বাহিনী। আওয়ামী লীগের নেতাদের হাসিনার মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা যেত কিন্তু সেটা না করে ২/৪ জন করে করে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করে জনগণকে ধোকা দেওয়া হচ্ছে। যারা এই তাজুল সিন্ডিকেটের পক্ষে সাফাই গাইছেন তাদের বলবো এগুলো কি দুর্নীতি নয়? এগুলো কি শহীদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি নয়?”
অভিযোগ অস্বীকার করে তাজুল বিবৃতিতে বলছেন, “পতিত স্বৈরাচার এবং গণহত্যাকারীদের বিরুদ্ধে নিষ্পত্তিকৃত এবং চলমান বিচার প্রক্রিয়া থেকে দৃষ্টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য একটি মহল সংঘদ্ধভাবে এই অপপ্রচার চালাচ্ছে, যাতে এই বিচার আর কোনোভাবে অগ্রসর না হতে পারে।
“আমার দায়িত্ব পালনকালে আমার বিরুদ্ধে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ কেউ পায়নি। আমি বিদায় নেওয়ায় পর বিশেষ মহল গণহত্যাকারীদের সুবিধা দেওয়ার জন্য এসব ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে বিচার প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।”
তিনি সংশ্লিষ্ট সকলকে এই ধরনের ‘মিথ্যাচার’ এবং ‘ঘৃণ্য’ অপতৎপরতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।

