বঙ্গোপসাগরের উত্তরাংশে সমুদ্রে উপস্থিতি জোরদার করতে পশ্চিমবঙ্গের হলদিয়ায় নতুন একটি নৌ ঘাঁটি স্থাপন করতে চলেছে ভারতের নৌবাহিনী।

চীনের ক্রমবর্ধমান নৌ তৎপরতা এবং বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে ঘিরে বদলাতে থাকা আঞ্চলিক নিরাপত্তার গতিপ্রকৃতির প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে ভারতীয় পত্রিকা ‘ইন্ডিয়া টুডে’।

শীর্ষ কয়েকটি প্রতিরক্ষা সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ঘাঁটি পূর্ণ কমান্ড নয় বরং একটি নৌ ‘ডিটাচমেন্ট’ হিসেবে কাজ করবে, যেখানে মূলত ছোট যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হবে।

ভারতের নৌ বাহিনী হলদিয়া বন্দরের বর্তমান অবকাঠামো ব্যবহার করেই দ্রুত ঘাঁটিটি চালু করতে চাইছে। প্রাথমিক পর্যায়ে সেখানে আলাদা একটি জেটি এবং প্রয়োজনীয় উপকূলীয় পরিকাঠামো ব্যবস্থা তৈরি করা হবে, যাতে বাড়তি খরচ কম রাখা যায়।

এই ঘাঁটিতে মোতায়েন করা হবে ‘ফাস্ট ইন্টারসেপ্টর ক্রাফট’ (এফআইসি) এবং ৩০০ টন ওজনের ‘নিউ ওয়াটার জেট ফাস্ট অ্যাটাক ক্রাফট’।

এই উচ্চগতির নৌজাহাজগুলো ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৪৫ নটিক্যাল মাইল বেগে চলতে সক্ষম, যা দ্রুত জবাব দেওয়া এবং সামুদ্রিক অভিযানের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে।

এই নৌযানগুলোতে থাকবে সিআরএন-৯১ কামান। পাশাপাশি এতে নাগাস্ত্রর মতো টহলদারি যান ব্যবহারও করা হতে পারে। এতে নজরদারি ও নিখুঁত হামলার সক্ষমতা অনেকটাই বাড়াবে।

এই নৌ ঘাঁটির গুরুত্ব কী?

বিশেষজ্ঞরা এই ঘাঁটি গড়ার সিদ্ধান্তের পেছনে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, ভারত মহাসাগরে চীনের নৌবাহিনীর গতিবিধি বেড়ে যাওয়া। সমুদ্রপথে অবৈধ অনুপ্রবেশ নিয়ে ভারতের উদ্বেগ।

ভারত-বাংলাদেশ উপকূলবর্তী অঞ্চলের অগভীর পানি ও ঘন ঘন নৌযান চলাচলের কারণে দ্রুতগতির যুদ্ধজাহাজগুলো এই এলাকায় বিশেষভাবে কার্যকর হওয়া।

এছাড়াও, বাংলাদেশে চীনের প্রতিরক্ষা ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের দীর্ঘদিনের সামরিক সম্পর্ক নিয়ে ভারতের উদ্বেগ।

এসবকিছু মিলিয়েই হলদিয়ায় ভারতের নৌ বাহিনীর নতুন ঘাঁটি তৈরির কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে।

নৌঘাঁটিটি আকারে তুলনামূলক ছোট হবে। সেখানে প্রায় ১০০ জন নৌ কর্মকর্তা ও নাবিক মোতায়েন করা হতে পারে। ফলে এটি পূর্ণ নৌকমান্ড নয়, বরং একটি ‘অপারেশনাল ইউনিট’ হিসাবে কাজ করবে।

কলকাতা থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে হলদিয়ায় ঘাঁটিটির অবস্থান হবে কৌশলগতভাবে বেশ সুবিধাজনক। এতে হুগলি নদী দিয়ে দীর্ঘ সময় সাপেক্ষ যাতায়াত এড়িয়ে সরাসরি বঙ্গোপসাগরে পৌঁছানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে।

বর্তমানে ভারতের পূর্ব উপকূলে বিশাখাপত্তনমে ইস্টার্ন নেভাল কমান্ডের সদর দপ্তর এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে বড় নৌঘাঁটি রয়েছে।

প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা বলছেন, হলদিয়ার জন্য জমি আগেই চিহ্নিত করা হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু বহুদিন ধরে নির্মাণ কাজ ঝুলে ছিল। নতুন ঘাঁটি গড়ার এই উদ্যোগ ভারতের নৌবাহিনীর সামগ্রিক সম্প্রসারণ পরিকল্পনার সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ।

হলদিয়ার এই নতুন সংযোজন ভারতের সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং সমুদ্রপথের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে দাবি করেছেন ভারতীয় কর্মকর্তারা।

Share.
Exit mobile version