রয়টার্সের প্রতিবেদন
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে দেশটিতে চীনের রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব দ্রুত বাড়ছে।
ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এই প্রভাব আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ সপ্তাহের জাতীয় নির্বাচনের পর বেইজিংয়ের প্রভাব আরও গভীর হতে পারে, যদিও বাংলাদেশের রাজনীতিক ও নীতিনির্ধারকেরা বলছেন—এত বড় প্রতিবেশী ভারতকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা বাস্তবসম্মত নয়।
আগামী বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এবারের নির্বাচনে এগিয়ে থাকা দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলই ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনার মতো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখেনি। শেখ হাসিনা ২০০৯ সাল থেকে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। তার দল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ, আর তিনি নয়াদিল্লিতে ‘স্বেচ্ছা নির্বাসনে’ অবস্থান করছেন।
এই প্রেক্ষাপটে ঢাকায় কূটনৈতিক তৎপরতা ও বিনিয়োগ জোরদার করেছে চীন। সম্প্রতি ভারতীয় সীমান্তের কাছাকাছি বাংলাদেশের ভূখণ্ডে একটি ড্রোন কারখানা স্থাপনের লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনকে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশি রাজনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠক করতে দেখা যাচ্ছে। এসব বৈঠকের তথ্য চীনা দূতাবাসের ফেসবুক পেজেও প্রকাশ করা হচ্ছে, যেখানে বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো প্রকল্পসহ বিভিন্ন সহযোগিতার বিষয় উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দাবিদার তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির রয়টার্সকে বলেন, বাংলাদেশের জনগণ মনে করে শেখ হাসিনার অপরাধের সহযোগী ছিল ভারত। তাঁর ভাষায়, ‘যে দেশ একজন সন্ত্রাসীকে আশ্রয় দেয় এবং তাঁকে আমাদের দেশকে অস্থিতিশীল করার সুযোগ করে দেয়, সেই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়া জনগণ মেনে নেবে না।’
তবে তারেক রহমান নিজে কিছুটা সংযত সুরে কথা বলেছেন। গত সপ্তাহে রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘আমরা সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাই, তবে তা অবশ্যই আমার জনগণ ও দেশের স্বার্থ রক্ষা করে।’
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক আরও অবনতির দিকে গেছে, যার বড় একটি কারণ ক্রিকেট। দুই দেশেই জনপ্রিয় এই খেলাকে ঘিরে উত্তেজনার সূত্রপাত হয়, যখন সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ভারতে হিন্দু সংগঠনগুলোর চাপের মুখে একজন জনপ্রিয় বাংলাদেশি বোলারকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া হয়।
এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ সরকার আগামী মার্চ থেকে মে পর্যন্ত আইপিএলের সম্প্রচার দেশে নিষিদ্ধ করে। পাশাপাশি ফেব্রুয়ারি–মার্চে অনুষ্ঠেয় পুরুষদের ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে, ফলে টুর্নামেন্ট থেকেই বাদ পড়ে বাংলাদেশ।
বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারত—উভয় দেশই একে অপরের নাগরিকদের জন্য ভিসা–সুবিধা সীমিত রেখেছে। শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে প্রকাশ্য বৈঠকও বিরল হয়ে পড়েছে। যদিও গত ডিসেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকায় এসে বিএনপির প্রধান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই সফরে তিনি তারেক রহমানের মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ভারতের পক্ষ থেকে শোক জানান।
এদিকে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠাতে অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের কাছে বারবার অনুরোধ জানালেও দিল্লির পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে গণ–অভ্যুত্থানের সময় প্রাণঘাতী দমনপীড়নের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে ঢাকার একটি আদালত শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার রায় ঘোষণার পর এই অনুরোধ আরও জোরালো হয়। জাতিসংঘের তথ্যমতে, ওই সময়ে বাংলাদেশে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত এবং হাজারো মানুষ আহত হন। তবে শেখ হাসিনা এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন।
‘প্রকাশ্য ও নীরব—দুই পথেই প্রভাব বাড়াচ্ছে চীন’
নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী একে অপরের বিরুদ্ধে বিদেশি শক্তির প্রতি আনুগত্যের অভিযোগ তুলেছে। জামায়াতের দাবি, বিএনপি ভারতের ঘনিষ্ঠ; অন্যদিকে বিএনপি বলছে, জামায়াতের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে।
একটি নির্বাচনী জনসভায় তারেক রহমান বলেন, ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়—সবার আগে বাংলাদেশ।’ এই বক্তব্যে তিনি নয়াদিল্লি ও পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির সামরিক সদর দপ্তরের দিকেই ইঙ্গিত করেছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ভারতের কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় স্বীকার করেছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলেও দিল্লিকে ভবিষ্যৎ যে কোনো সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। তবে এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রয়টার্সের অনুরোধে কোনো মন্তব্য করেনি।
অন্যদিকে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। দুই দেশের মধ্যে বছরে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য হয়, যার প্রায় ৯৫ শতাংশই চীনা পণ্যের আমদানি। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর চীনা কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে শত শত মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। বিপরীতে, হাসিনার আমলে বাংলাদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণ করা আদানি গ্রুপসহ ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন কোনো বড় চুক্তি বাস্তবায়ন হয়নি।
নয়াদিল্লিভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিকস প্রোগ্রেসের জ্যেষ্ঠ ফেলো কনস্টানটিনো জাভিয়ার বলেন, ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের সংকট থেকে চীন লাভবান হচ্ছে এবং প্রকাশ্য ও গোপন—দুই পথেই দেশটি তার প্রভাব বাড়াচ্ছে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা কমে যাওয়া ও ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছে বেইজিং।
বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী দিনে বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে পারে—বিশেষ করে অর্থনৈতিক প্রণোদনার কারণে। পাশাপাশি, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতের মতো করে সংখ্যালঘু ইস্যুতে চীন কখনো প্রকাশ্যে চাপ সৃষ্টি করে না—এটিও ঢাকার জন্য একটি বিবেচ্য বিষয়।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের থমাস কিন বলেন, ঢাকা ও দিল্লি যদি সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ সরকার বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক পূর্ণ গতিতে এগিয়ে নিতে উৎসাহী হবে।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন মনে করেন, চীন ও ভারত—উভয় দেশই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ভাষায়, ‘ক্ষমতায় এসে কোনো দল এতটা বোকা হবে না যে ভারতকে পুরোপুরি উপেক্ষা করবে।’
বাংলাদেশের তিন দিকে ভারতের সীমান্ত এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর—এই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাণিজ্য, পরিবহন ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা অপরিহার্য। একইভাবে ভারতের জন্যও বাংলাদেশের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে স্থল সীমান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রতিবছর প্রায় ১৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য হয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় ভারতীয় আদানি গ্রুপ সরবরাহ বাড়ালেও, শেখ হাসিনার আমলে করা চুক্তির উচ্চমূল্য নিয়ে বাংলাদেশে সমালোচনা রয়েছে।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের সহায়তা বাংলাদেশের স্বাধীনতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, দুই দেশের মধ্যে পানিবণ্টন ও সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের মতো পুরোনো বিরোধ এখনো অমীমাংসিত। অনেক বাংলাদেশির ধারণা, শেখ হাসিনার অজনপ্রিয় শাসনকে ভারত বৈধতা দিয়েছিল।
এদিকে তরুণদের নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারাও ভারতের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছেন। জেন–জি সমর্থিত এই দলটি এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট বেঁধেছে। দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম রয়টার্সকে বলেন, ‘দিল্লির আধিপত্য তরুণদের মধ্যে গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে। এটা শুধু নির্বাচনী স্লোগান নয়—এটাই এবারের নির্বাচনের বড় ইস্যুগুলোর একটি।’

