আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় মিশে থাকা কিছু সাধারণ অভ্যাস অজান্তেই মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপর্যাপ্ত ঘুম, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং মানসিক চাপের মতো বিষয়গুলো দীর্ঘমেয়াদে স্নায়ুতন্ত্রকে দুর্বল করে দেয়, যা ডিমেনশিয়ার মতো স্নায়বিক রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে তোলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের সঙ্গে শারীরিক ও মানসিক অভ্যাসের গভীর সংযোগ রয়েছে। যেমন, দীর্ঘক্ষণ ধরে বসে থাকার ফলে মস্তিষ্কে রক্ত ও অক্সিজেনের সরবরাহ কমে যায়। এটি স্মৃতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিপোক্যাম্পাসের ক্ষতি করে। একইভাবে, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাদ্য গ্রহণ করলে শরীরে প্রদাহ ও অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বাড়ে, যা স্নায়ুকোষের জন্য ক্ষতিকর।
ঘুমের ঘাটতিকে মস্তিষ্কের জন্য অন্যতম বড় শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পর্যাপ্ত গভীর ঘুম না হলে মস্তিষ্ক থেকে ক্ষতিকর টক্সিন পরিষ্কার হতে পারে না। এর ফলে মনোযোগ কমে, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয় এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হ্রাস পায়। ঘুমানোর আগে মোবাইল বা ল্যাপটপের নীল আলো মেলাটনিন হরমোন নিঃসরণে বাধা দিয়ে ঘুমের এই চক্রকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
মানসিক স্বাস্থ্যও এক্ষেত্রে সমান গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ বা স্ট্রেস থেকে নিঃসৃত কর্টিসল হরমোন সরাসরি হিপোক্যাম্পাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আবার, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা একাকীত্ব বোধ জ্ঞানীয় ক্ষমতা হ্রাসের ঝুঁকি দ্বিগুণ করতে পারে। এর পাশাপাশি, একই সময়ে একাধিক কাজ করার (মাল্টিটাস্কিং) প্রবণতা মস্তিষ্কের মনোযোগকে বিভক্ত করে ফেলে, যা মানসিক ক্লান্তি বাড়ায় এবং কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
কিছু অভ্যাস আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ মনে হলেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। যেমন, উচ্চ শব্দে গান শোনার কারণে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলে মস্তিষ্ককে বাড়তি চাপ নিতে হয়, যা স্মৃতিশক্তিকে দুর্বল করতে পারে। শরীরে পানির সামান্য ঘাটতি বা ডিহাইড্রেশনও মনোযোগ এবং স্মৃতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এছাড়া, নতুন কিছু শেখা বা মানসিক ব্যায়ামের মতো উদ্দীপনার অভাবে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের সংযোগগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে।
তবে জীবনযাত্রায় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এনে এই ঝুঁকিগুলো মোকাবেলা করা সম্ভব। মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখতে বিশেষজ্ঞরা কিছু পরামর্শ দিয়েছেন:
* **পর্যাপ্ত ঘুম:** প্রতিদিন ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুম নিশ্চিত করা।
* **সক্রিয় জীবন:** নিয়মিত ব্যায়াম বা হাঁটাচলার মাধ্যমে মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বাড়ানো।
* **সুষম খাদ্য:** খাদ্যতালিকায় ফল, শাক-সবজি, মাছ ও বাদামের মতো স্বাস্থ্যকর খাবার রাখা।
* **মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ:** ধ্যান, যোগব্যায়াম বা গভীর শ্বাসের অনুশীলনের মাধ্যমে স্ট্রেস কমানো।
* **সামাজিক সংযোগ:** পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা।
* **মানসিক ব্যায়াম:** বই পড়া, নতুন ভাষা শেখা বা ধাঁধা সমাধানের মাধ্যমে মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখা।
* **পর্যাপ্ত পানি পান ও স্ক্রিন টাইম কমানো:** শরীরকে সতেজ রাখা এবং রাতে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার সীমিত করা।
সচেতন জীবনযাপনের মাধ্যমেই মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ঠিক রাখা এবং ডিমেনশিয়ার মতো রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

