মাসকাওয়াথ আহসান, সাংবাদিক
ইরানে ইন্টারনেট বন্ধ করে জনবিদ্রোহ দমনের চেষ্টা চলছে। এই দৃশ্য আমাদের পরিচিত। ২০২৪ এর জুলাই মাসে বাংলাদেশে ঠিক এরকম ঘটনা ঘটেছিলো। ইরানের চলমান জনবিদ্রোহ ভঙ্গুর অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, ক্ষমতাসীনের দুর্নীতি, ভাত দেবার মুরোদ নেই ধর্মের কিল দেবার গোসাই নীতির বিরুদ্ধে পুঞ্জীভুত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
ইরানের ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পেছনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলো বাজারিস, ক্ষুদে দোকানিদের জোট। ইরানের গত একশো বছরের রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় এই বাজারিস জোট সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। সাম্প্রতিক এই বিদ্রোহের সূচনা সেই ক্ষুদে দোকানিদের মাধ্যমে। ঐতিহ্যগতভাবে ইসলামি ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে এদের ঘনিষ্ট সম্পর্ক হলেও; তীব্র ডলার সংকটে; সস্তায় ডলার কেনার সুযোগ থেকে ক্ষুদে আমদানিকারকদের বঞ্চিত করা হলে; রাতারাতি পণ্য সংকট তৈরি হয়। দোকানের পণ্যের শেলফগুলো খালি হয়ে যেতে শুরু করে। ফলে বাজারিসরা বিক্ষোভ করতে বাধ্য হয়।
তীব্র বেকারত্ব, দারিদ্র্য জর্জরিত ক্রেতারা এই বিক্ষোভে যোগ দিলে ইরানের প্রায় একশো জায়গায় বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভ দমনে শাসকের খুনে বাহিনী পথে নেমে এলে শত শত জীবনের শুল্ক নেয় তারা। হাসপাতালের মর্গগুলো ভরে ওঠে লাশে। হাসপাতালে চিকিতসা সামগ্রী অপ্রতুল হওয়ায়; চিকিতসার অভাবে অগণন আহত ব্যক্তি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। সরকারি বাহিনী মৃতদেহ ফেরত দিতে স্বজন হারানো পরিবারগুলোর কাছে চড়া অর্থমূল্য দাবি করতে থাকে।
মিছিলের সব হাত পা মুখ কখনো এক হয় না। ফলে ১৯৭৯ সালে ক্ষমতা হারানো রাজ পরিবারের ক্ষমতালোভী রাজকুমার রেজা শাহ পাহলোভী নির্বাসিত জীবনে বসে উস্কানি দিতে থাকে। এই ক্ষমতালোভী রাজকুমার ইজরায়েলের হাতের পুতুল; যে ইজরায়েল কিছুকাল আগে ইরানে হামলা চালিয়েছিলো। পাহলোভীর সমর্থকেরা ইরানের পতাকার মাঝ থেকে আরবি হরফ সরিয়ে রাজতন্ত্রের প্রতীক সিংহ ও সূর্য বসিয়ে প্রচারণা চালাতে থাকে। ভারতীয় মিডিয়া ইসলামি চিহ্ন সরিয়ে রাজতন্ত্রের চিহ্ন বসানোর ব্যাপারটাকে, ইরানিরা সূর্য দেবতার উপাসনায় ফিরে যেতে চায় শিরোনাম দিয়ে বগল বাজাতে থাকে।
ইরানের চলমান বিপ্লবটি আসলে গরীবী ও বেকারত্বের দ্রোহ। সীমাহীন দারিদ্র্য, অনিশ্চিত ভবিষ্যত, মাদকাসক্তিতে দারিদ্র্য রেখার নীচে বসবাস করা মানুষেরা খামেনীর শাসনে বীতশ্রদ্ধ। ধর্ম আফিম নেশা পেটের খাবার জোগাড় করতে পারে না। উপরন্তু ক্ষমতা কাঠামোর দুর্নীতি ও বৈষম্য চোখে পড়ার মতো। খামেনীর জন্য বিপদে পড়লে পুতিনের আতিথেয়তার ব্যবস্থা রয়েছে; বাংলাদেশের শেখ হাসিনা যেমন মোদির আতিথেয়তা পেয়েছেন বিপদে পড়ে। বাংলাদেশের দুর্নীতিবাজ আমলা-রাজনীতিকের মতো ইরানের দুর্নীতিবাজ সেনা ও বেসামরিক কর্মকর্তা আর ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাদের দেশ লুন্ঠন করা টাকায় সেকেন্ড হোম ও ব্যাংক ব্যালেন্স রয়েছে দেশের বাইরে। ফলে চলমান বৈষম্যবিরোধী জনবিক্ষোভ খুবই যুক্তিসঙ্গত।
ইরানকে কেবল ১৯৭৯ সালের আগের ইঙ্গ-মার্কিন মদতপুষ্ট শাহের শাসনামলের কতগুলো স্কার্ট পরা মেয়ের লাস্যভরা ছবি দিয়ে চিনলে চলবে কেন! সেইদিন স্মার্ট হওয়া এমেরিকা কি করে ঐতিহ্যবাহী পারস্যকে স্মার্টনেস শেখাবে! পারস্য ছিলো বিশ্বসভ্যতার সংস্কৃতিকেন্দ্র। কবিতা-গান-চিত্রকলা-বিজ্ঞান গবেষণার প্রাণকেন্দ্র ছিলো এই জনপদ। কাজেই ১৯৭৯ সালের বিপ্লবকে ইসলামি বিপ্লবের আলখাল্লা পরিয়ে যেভাবে লৌহ পর্দায় অবগুন্ঠিত করা হয়েছে; তা ইরানের বিশেষত নারী সমাজকে অবরোধবাসিনী করেছে। ইরানের মোল্লারা নারী স্বাধীনতাকে ‘বিকিনি পরার স্বাধীনতা’ বলে কটাক্ষ করেন। কিন্তু জনসংখ্যার অর্ধেক শক্তি এই নারী শিক্ষা-কর্মসংস্থান-আত্মনিয়ন্ত্রণের স্বাধীনতা না পেলে একটি দেশের অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়তে বাধ্য; তার প্রমাণ ইরান। এই যে পাকিস্তান অর্থনীতিতে বাংলাদেশের চেয়ে দুর্বল; এই পার্থক্য তৈরি করেছে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে নারীর অংশগ্রহণ; আর পাকিস্তানের অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে নারীর অনুপস্থিতি।
খামেনীর কোরান হাদিসের শিক্ষা আর নিজের সুবিধা মতো ব্যাখ্যা হয়তো জোর করে ক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করেছে; কিন্তু নারী অধিকার সম্পর্কে অসচেতনতা, অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকায়; ইরান আজ ব্যর্থ একটি রাষ্ট্র।
ইসলামপন্থী খামেনীর সঙ্গে খ্রীস্টিয়পন্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইহুদিপন্থী নেতানিয়াহুর দ্বন্দ্ব আসলে তিন মোল্লা-যাজক-রাবাইয়ের দ্বন্দ্ব যারা খেলনা ধর্মযুদ্ধকে সামনে রেখে জনতুষ্টির হাওয়াই মিঠাই খাইয়ে মূলত নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখতে আকুল তিন গণশত্রু। অসংখ্য স্বপ্ন হত্যার খলনায়ক এই ফ্যাসিস্টেরা একবিংশ শতকের লজ্জা।
ইরানের অধিকার বঞ্চিত মানুষের লড়াইটি নিজের মতো করে এগিয়ে যেতে পারলে জনবিপ্লব হয়তো এর গন্তব্যে পৌঁছাতে পারতো। কিন্তু নেতানিয়াহুর মোসাদ ঢুকে মসজিদ পুড়িয়ে দেয়া, ট্রাম্পের সি আই এ ঢুকে ‘লাস্যময়ী তরুণীর সিগ্রেটের আগুনে খামেনী’র ছবি পুড়ানোর’ ক্যান্ডিড ছবি ভাইরাল করে; অবরোধ বাসিনী সেই নারীর মুক্তির দ্রোহকে বাধাগ্রস্ত করছে; খামেনীর খুনে বাহিনীর আঘাতে যার মুখমণ্ডল রক্তাক্ত হলে যিনি বলেন, ৪৭ বছর ধরে মরেই আছি; আমার কিসের ভয়!
এপাশ থেকে মোদির গেরুয়া ‘র’ ইসলাম কুপিয়ে সূর্য দেবতার উপাসনার ডাক দিয়ে সুষুপ্ত ঘটক হিসেবে উত্থিত হয়েছে। কোথাও জনমানুষের বিপ্লব দেখলেই নিজ নিজ ধান্দা বেচতে আসা বিদ্বেষের ফেরিওয়ালারা ব্যর্থ করে দেয়; নিপীড়িত মানুষের জেগে ওঠার আর ভাগ্যবদলের সম্ভাবনাগুলো।
কৃতজ্ঞতা-লেখকের ফেসবুক পোষ্ট থেকে নেওয়া।


