জীবনে সুখী হওয়ার জন্য কেবল অর্থ উপার্জনই যথেষ্ট নয়, বরং সেই অর্থকে কীভাবে ব্যবহার ও পরিচালনা করা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে মানসিক প্রশান্তি ও সন্তুষ্টি। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা বলছে, একজন মানুষের ‘মানি পারসোনালিটি’ বা আর্থিক ব্যক্তিত্বই তার জীবনের সুখ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। এর মানে হলো, টাকার প্রতি আপনার মনোভাব, খরচের ধরন এবং সঞ্চয়ের অভ্যাস আপনার আয়ের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা এই ধারণাকে আরও প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রায় ৭৭,০০০ ব্যাংক লেনদেন বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, যারা নিজেদের ব্যক্তিত্ব ও জীবনদর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খরচ করেন, তারা অন্যদের চেয়ে বেশি সুখী হন। উদাহরণস্বরূপ, একজন বহির্মুখী বা মিশুক স্বভাবের মানুষ ভ্রমণে বা সামাজিক কার্যকলাপে অর্থ ব্যয় করে যে আনন্দ পান, একজন স্বাস্থ্যসচেতন ব্যক্তি সেই আনন্দ পান স্বাস্থ্য বা ফিটনেস খাতে খরচ করে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জো গ্ল্যাডস্টোনের মতে, “টাকা দিয়ে আনন্দ কেনা যায়—যদি সেই টাকা এমন কিছুতে খরচ করা হয় যা আপনার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মানানসই হয়।”

একইভাবে, যুক্তরাজ্যে ২,৪৫০ জনের ওপর চালানো আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মানুষের সঞ্চয়ের লক্ষ্য তাদের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মেলে, তারা অর্থ জমাতে বেশি সফল হন। অর্থাৎ, আর্থিক লক্ষ্য যদি ব্যক্তিগত মূল্যবোধের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তবে তা পূরণের সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।

কেবল খরচ বা সঞ্চয় নয়, আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য মানসিক দৃঢ়তা ও বুদ্ধিমত্তারও প্রয়োজন রয়েছে। নেদারল্যান্ডসের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, যারা আত্মনিয়ন্ত্রিত এবং নিজের জীবনের ওপর আস্থা রাখেন, তারা বাজেট তৈরি, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং বিনিয়োগের মতো বিষয়ে বেশি পারদর্শী হন। ইতালির গবেষকরাও দেখেছেন, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, মানসিক বুদ্ধিমত্তা ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্ব কর্মজীবনে সাফল্যের পাশাপাশি অর্থ ব্যবস্থাপনার দক্ষতাও বাড়ায়।

অন্যদিকে, যাদের মধ্যে উদ্বেগ বা অস্থিরতার (neuroticism) মাত্রা বেশি, তারা আর্থিক চাপে সহজেই ভেঙে পড়েন এবং অল্প আয়ের কারণে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যও ঝুঁকির মুখে পড়ে। বিপরীতে, যারা চিন্তাশীল ও দায়িত্ববান, তারা আর্থিক চাপের মধ্যেও নিজেদের স্থির রাখতে পারেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আর্থিক ব্যক্তিত্ব জন্মগত কোনো বিষয় নয়, বরং এটি চর্চার মাধ্যমে গড়ে তোলা সম্ভব। অপ্রয়োজনীয় খরচ এড়িয়ে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা, ভবিষ্যতের জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ এবং নিজের সন্তুষ্টির খাতগুলো চিহ্নিত করে খরচ করার অভ্যাস গড়ে তুললে আর্থিক স্বাধীনতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়ে। এই ইতিবাচক পরিবর্তন কেবল অর্থনৈতিক জীবনেই নয়, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যেও সুফল বয়ে আনে।

Share.
Exit mobile version