অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারের (এএসডি) সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা না থাকলেও বিভিন্ন থেরাপি ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আক্রান্ত শিশুর দক্ষতা বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা সম্ভব। মূলত আচরণগত ও যোগাযোগমূলক বিভিন্ন থেরাপি, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং পরিবারের সক্রিয় অংশগ্রহণ এক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুর মধ্যে অটিজমের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত রোগ নির্ণয় অত্যন্ত জরুরি। সাধারণত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী বা শিশু স্নায়ু বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল শিশুর আচরণ ও সামাজিক যোগাযোগের বিকাশ পর্যবেক্ষণ করে এটি নির্ণয় করে থাকেন। এর জন্য কোনো নির্দিষ্ট মেডিকেল পরীক্ষা নেই, তবে সহায়ক হিসেবে শ্রবণশক্তি পরীক্ষা, রক্তে সীসার মাত্রা পরীক্ষা এবং এডিওএস-২ (ADOS 2) এর মতো মনস্তাত্ত্বিক স্ক্রিনিং টুল ব্যবহার করা হয়। তিন বছর বয়সের আগেই অটিজম শনাক্ত করা সম্ভব।
অটিজমের ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো বিভিন্ন থেরাপির সমন্বয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:
* **অ্যাপ্লাইড বিহেভিয়ারাল অ্যানালাইসিস (ABA):** এটি একটি বহুল ব্যবহৃত থেরাপি, যার মাধ্যমে ইতিবাচক আচরণকে উৎসাহিত করা হয় এবং নেতিবাচক আচরণ কমানোর চেষ্টা করা হয়। শিশুদের নতুন দক্ষতা শেখাতে পুরস্কারের মাধ্যমে অনুপ্রাণিত করা হয়।
* **স্পিচ থেরাপি:** এর মাধ্যমে শিশুর কথা বলার দক্ষতা ও যোগাযোগের সক্ষমতা বাড়ানো হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে শুরু করা গেলে এটি শিশুর শব্দভান্ডার তৈরিতে সহায়তা করে।
* **অকুপেশনাল থেরাপি:** এই থেরাপি দৈনন্দিন জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা, যেমন—খেলার মাধ্যমে শেখা বা বড়দের ক্ষেত্রে কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনে সাহায্য করে। এটি শিশুর মোটর স্কিল ও ইন্দ্রীয়গত সমস্যা উন্নয়নেও ভূমিকা রাখে।
* **ফিজিক্যাল থেরাপি:** এটি শিশুর চলাফেরা ও শারীরিক ভারসাম্য উন্নত করতে সহায়তা করে।
থেরাপির পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে ঔষধের প্রয়োজন হতে পারে। যদিও ঔষধ অটিজমের মূল লক্ষণ নিরাময় করে না, তবে এর সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু গুরুতর সমস্যা, যেমন—অতিরিক্ত অস্থিরতা বা মানসিক অবসাদের মতো উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে অ্যান্টিসাইকোটিক বা অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট জাতীয় ঔষধ দেওয়া হয়।
পুষ্টির বিষয়টিতেও নজর রাখা প্রয়োজন। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, গ্লুটেন (গম, বার্লি) এবং কেসিন (দুগ্ধজাতীয় খাবার) সমৃদ্ধ খাবার কোনো কোনো শিশুর মধ্যে অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলতে পারে। তবে খাদ্যতালিকা থেকে এগুলো বাদ দেওয়ার আগে অবশ্যই একজন পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিতে হবে, যেন শিশু সুষম খাদ্য থেকে বঞ্চিত না হয়।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অটিজম আক্রান্ত শিশুর সঙ্গে কীভাবে খেলতে হয় এবং যোগাযোগ স্থাপন করতে হয়, তা শিখে তারা শিশুর সামাজিক দক্ষতা বাড়াতে ও চ্যালেঞ্জিং আচরণ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারেন। বর্তমানে অটিজম নিয়ে সচেতনতা বাড়ায় আগের চেয়ে দ্রুত সময়ে এর শনাক্তকরণ ও ব্যবস্থাপনা শুরু করা সম্ভব হচ্ছে, যা শিশুদের ভবিষ্যৎ জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

