ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁও সীমান্ত থেকে রাজ্য পুলিশ বাংলাদেশের ওসমান শরীফ হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদসহ দুইজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়েছে।
প্রায় আড়াই মাস আগে ঢাকার পুলিশ তাদের ভারতে অবস্থানের দাবি করে এলেও তখন দেশটি জোরালোভাবে তা অস্বীকার করেছিল।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার ১৬ দিন পর ২৮ ডিসেম্বর এ মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিমের সঙ্গে তার সহযোগী মোটরসাইকেল চালক আলমগীর হোসেন ভারতের মেঘালয়ে থাকছেন বলে দাবি করে। এমন দাবির মুখে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সাফ সেসময় জানিয়ে দেয় ফয়সাল তাদের দেশে নেই।
অবশেষে রোববার ভারতের সংবাদমাধ্যমই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্সের (এসটিএফ) বিজ্ঞপ্তির বরাতে ফয়সাল ও আলমগীরকে গ্রেপ্তারের তথ্য দিল।
ওই বিজ্ঞপ্তির বরাতে রোববার সন্ধ্যায় বার্তা সংস্থা এএনআই’র প্রতিবেদনে বলা হয়, শনিবার রাতে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বনগাঁ থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
এসটিএফ বলছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এ অভিযানে নামে তারা। দুই বাংলাদেশি তাদের দেশে চাঁদাবাজি, হত্যাসহ গুরুতর অপরাধ করে ভারতে অনুপ্রবেশ করেছে বলে পুলিশের কাছে ‘গোপন ও বিশ্বাসযোগ্য’ তথ্য ছিল। তারা সুযোগ পেলে বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বনগাঁ সীমান্ত এলাকায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছিল।
এই তথ্যের ভিত্তিতে শনিবার গভীর রাতে বনগাঁ এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাতে এসটিএফ বলছে, ফয়সাল করিম ও সহযোগী আলমগীর হোসেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্মী ওসমান হাদিকে হত্যা করে ভারতে পালিয়ে যায়। মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে তারা অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করে এবং ভারতের বিভিন্ন স্থানে ঘোরাফেরার পর বাংলাদেশে ‘ফেরার উদ্দেশ্যে’ শেষ পর্যন্ত বনগাঁয় যায়।
এ বিষয়ে মামলা করা হয়েছে জানিয়ে এসটিএফ বলছে, রোববার আদালতে হাজির করার পর তাদের পুলিশ হেফাজতে পাঠানো হয়েছে।
চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে শীতল হয়ে আসা ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক যখন একটা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে তখনই প্রতিবেশী দেশটি থেকে এই দুজনকে গ্রেপ্তারের খবর এল।
এ বিষয়ে ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার বলেন, “আমরা বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে বিষয়টা জেনেছি। এখন যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানার চেষ্টা করছি। “
বাংলাদেশে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা পরদিন গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে রাজধানীর বিজয়নগর পানির ট্যাংকির সামনে গুলিবিদ্ধি হন ওসমান হাদি।
ওই সময়ের একটি ভিডিওতে দেখা যায় একটি মোটরসাইকেলে করে দুজন এসে কাছ থেকে হাদির মাথায় গুলি করেন। পরে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৯ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়।
ওই ভিডিও এর ভিত্তিতে পুলিশ দাবি করেছিল, অটোরিকশায় থাকা হাদিকে গুলি করা মোটরসাইকেলের পেছনে ছিলেন ফয়সাল এবং সেটি চালাচ্ছিলেন আলমগীর।
ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা সেসময় বাংলাদেশে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। এজন্য ভারতকে দায়ী করেও তখন বিক্ষোভ হয়। তখন ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশন অভিমুখে বিক্ষোভ কর্মসূচিতে গোলযোগও হয়। তখন দাবি করা হয়, হাদিকে গুলি করে আততায়ীরা ভারতে পালিয়ে গেছেন।
সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় হাদি মারা যাওয়ার পর বাংলাদেশজুড়ে বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। তখন বাংলাদেশে থাকা ভারতীয় হাই কমিশন ও সহকারী হাই কমিশনের সামনে এবং ভারতে বাংলাদেশের হাই কমিশন ও উপ হাই কমিশনের সামনে বিক্ষোভ ও সংঘাতের ঘটনা ঘটে।
আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি ফয়সাল ও আলমগীরের গ্রেপ্তারের খবর সামনে আসার পরপরই রোববার সন্ধ্যায় ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “ওরা আমাদেরকে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। তবে আমিতো জানতাম যে ওরা ভারতে গেছে। যথেষ্ট প্রমাণ হাতে নিয়েই আমি কথা বলেছি। এমনকি ওদের একটা রাজ্য পুলিশও আমাদের সহায়তা করেছিল তখন।”
এই পুলিশ কর্মকর্তাই গত ২৮ ডিসেম্বর ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, ফয়সাল ও তার সহযোগী আলমগীর হত্যাকাণ্ডের পরপরই সীমান্ত পার হয়ে মেঘালয়ে যান। তাদের দুজনকে সহায়তার অভিযোগে মেঘালয় পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে বলেও জানান তিনি।
সেদিন তিনি বলেন, “ফয়সাল ও আলমগীর প্রথমে ঢাকা থেকে সিএনজিতে করে আমিনবাজারে যান। সেখান থেকে মানিকগঞ্জের কালামপুরে ও পরে প্রাইভেট কারে করে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে পৌঁছান।
“সেখানে ফিলিপ নামে একজন তাদেরকে সীমান্ত পার করে পুত্তির নামে একজনের কাছে হস্তান্তর করে। তারপর সামি নামে আরেক ট্যাক্সি ড্রাইভারের কাছে তাকে দেওয়া হয়। সামি তাদেরকে মেঘালয়ের তুরা শহরে পৌঁছে দেয়।”
পুলিশ কর্মকর্তা নজরুল সেদিন বলেছিলেন, “অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে আমরা মেঘালয় পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পেরেছি, সেখানে তারা পুত্তি ও সামিকে গ্রেপ্তার করেছে।”
তবে এ সংবাদ সম্মেলনের ঘণ্টা দুই পরেই ফয়সালের ভারতে অবস্থান করা এবং দুজনকে গ্রেপ্তারের কথা অস্বীকার করে বিএসএফ ও মেঘালয় পুলিশ।
মেঘালয় পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তার বরাতে সেদিন হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, “বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযুক্তদের কাউকেই গারো পাহাড়ে খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং কোনো গ্রেপ্তারও করা হয়নি।”
হাদি হত্যায় অভিযুক্ত ফয়সাল ও আলমগীরের সীমান্ত পার হওয়া বা এ ঘটনায় পুত্তি ও সামি নামে দুজনের ভূমিকার পক্ষে কোনো গোয়েন্দা তথ্য, সরেজমিন যাচাই বা অভিযানগত কোনো প্রমাণ নেই বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়।
মেঘালয় পুলিশের ওই শীর্ষ কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়, “পুত্তি বা সামি নামে কাউকেই মেঘালয়ের কোথাও শনাক্ত করা যায়নি, খুঁজে পাওয়া বা গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। ধারণা করা যায়, ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোনো প্রকার ভেরিফিকেশন বা সমন্বয় ছাড়াই এই বিবরণ তৈরি করা হয়েছে।”
ওই সময় একাধিক ভিডিও বার্তা দেন ফয়সাল করিম। তিনি দুবাইয়ে অবস্থান করছেন দাবি করে তিনি আরব আমিরাতের মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসার ছবি ভিডিওতে দেখান।
তবে শেষ পর্যন্ত ভারত থেকে ফয়সালের গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া গেল।
এ দুজনকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এসটিএফের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে তারা ভারতে ঢোকে। এরপর থেকে বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করে এবং সর্বশেষ বনগাঁও সীমান্তে আসে আবার বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার জন্য।
গোপন তথ্যের পর শনিবার রাতে এসটিএফ বনগাঁও সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে রাহুল ওরফে ফয়সাল করিম মাসুদ (৩৭) এবং আলমগীর হোসেনকে (৩৪) গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, ফয়সাল ও আলমগীর মিলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্মী ওসমান হাদিকে হত্যা করে পালিয়ে যান।

