যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নতুন এক ভূ–রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করেছে ইরান। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই তেলপথে কার্যত ‘টোল বুথ’ ব্যবস্থা চালু করে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে দেশটি, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতি সম্ভাব্য মন্দার দিকে ধাবিত হচ্ছে। বর্তমানে প্রণালির দুই পাশে প্রায় ২ হাজার জাহাজ আটকা পড়ে আছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও)। অনেক শিপিং কোম্পানি বিকল্প দীর্ঘ পথ না নিয়ে অপেক্ষা করাকেই নিরাপদ মনে করছে।
টোল আরোপের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন
ইরানের পার্লামেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও আইন পাস না করলেও বাস্তবে ইতোমধ্যে একটি ‘টোল বুথ’ ব্যবস্থা চালু করেছে দেশটির রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। আন্তর্জাতিক শিপিং জার্নাল ‘লয়েডস লিস্ট’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই সপ্তাহে অন্তত ২৬টি জাহাজ এই ব্যবস্থার আওতায় নির্ধারিত রুট ব্যবহার করে প্রণালি অতিক্রম করেছে।
এই প্রক্রিয়ায় জাহাজ অপারেটরদের আগে থেকেই ইরানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আবেদন করতে হয়। জাহাজের নথি, পণ্য, ক্রু তালিকা ও গন্তব্যসহ বিস্তারিত তথ্য যাচাই করে আইআরজিসি অনুমতি দেয়। অনুমোদন পেলে একটি ক্লিয়ারেন্স কোড দেওয়া হয় এবং নির্দিষ্ট রুট ধরে ইরানি জলসীমা দিয়ে নিরাপত্তা সহকারে জাহাজ পার করে দেওয়া হয়। যেসব জাহাজ এই স্ক্রিনিংয়ে উত্তীর্ণ হতে পারে না, তাদের প্রণালিতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় না। ইতোমধ্যে ‘সেলেন’ নামের একটি কনটেইনার জাহাজকে অনুমতি না থাকায় ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
কেন এই পদক্ষেপ
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের ব্যয় মেটানো এবং কৌশলগত চাপ সৃষ্টি—এই দুই লক্ষ্যেই ইরান এ পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশটির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিকে একটি ‘করিডোর’ হিসেবে বিবেচনা করে এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিনিময়ে শুল্ক আদায় করা হবে।
ইতোমধ্যে কিছু জাহাজ থেকে ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত টোল আদায়ের তথ্যও সামনে এসেছে। একইসঙ্গে ইরান যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে প্রণালির ওপর নিজেদের কর্তৃত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও দাবি করছে।
জ্বালানি বাজারে প্রভাব
এই পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে, যা যুদ্ধের আগের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। ফলে এশিয়ার অনেক দেশ জ্বালানি রেশনিং ও শিল্প উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এটি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে।
কারা পারাপারের অনুমতি পাচ্ছে
ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো ছাড়া অন্যান্য দেশের জাহাজ নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে প্রণালি ব্যবহার করতে পারবে। ইতোমধ্যে চীন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও মিশরের কিছু জাহাজ পারাপারের অনুমতি পেয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে চীনা মুদ্রা ইউয়ানে টোল পরিশোধের ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে। তবে সব দেশ এই টোল পরিশোধ করছে না—ভারত দাবি করেছে, তাদের জাহাজ চলাচলের জন্য কোনো ফি দেওয়া হয়নি।
আইনি বৈধতা নিয়ে বিতর্ক
হরমুজ প্রণালিতে টোল আদায়ের বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বৈধ কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। জাতিসংঘের সমুদ্র আইন (ইউএনসিএলওএস) অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক প্রণালিতে সব জাহাজের অবাধ চলাচলের অধিকার রয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপত্তার অজুহাতে কিছু নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা গেলেও ব্যাপকভাবে ফি আদায় করা ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ইরানের এই পদক্ষেপকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি অ্যাডনকের প্রধান নির্বাহী সুলতান আল-জাবের। তিনি এটিকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাস’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এর প্রভাব বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজার, খাদ্য ও ওষুধের দামে পড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে এই নতুন উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলতে পারে এবং এর প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে অনুভূত হতে পারে।

