জনগণের সমর্থন পেয়ে বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের দেখভালের জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘আলাদা একটি বিভাগ খোলা হবে’ বলে জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
এই পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আপনারা যখন কথা আপনাদের কষ্টের কথা, ব্যথার কথা, ত্যাগের কথা বলার জন্য ব্যাকুলভাবে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছিলেন। অস্থিরভাবে প্রকাশ করছিলেন নিজের মনের কষ্টের কথা। তখন আমি এবং নজরুল ইসলাম খান সাহেব বসে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। বিএনপি এর আগে যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিল তারা মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় নামক একটি মন্ত্রণালয় তৈরি করেছে যা ১৯৭১ সালে যারা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন অর্থাৎ এক কথায় মুক্তিযোদ্ধা পরিবারদের কল্যাণ তারা দেখভাল করে থাকে।
“আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশের মানুষের সমর্থনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল আগামী দিনে সরকার গঠনে সক্ষম হলে এই শহীদ পরিবার যারা আছেন জুলাই যোদ্ধা যারা আছেন, জুলাই আন্দোলনের যারা শহীদ পরিবার বা যোদ্ধা আছেন তাদের যে কষ্টের কথাগুলো যে কয়জন ব্যক্তি, যে কয়জন মানুষ তুলে ধরেছেন, সেই কষ্টগুলোর যাতে আমরা কিছুটা হলেও সমাধান করতে পারি…যাকে আমরা হারিয়ে ফেলেছি তাকে তো আমরা ফিরিয়ে আনতে পারবো না। কিন্তু যারা পেছনে রয়ে গিয়েছেন সেই পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন সুবিধা-অসুবিধাগুলো যাতে দেখভাল করতে পারি সেজন্য মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আমরা আরেকটি ডিপার্টমেন্ট তৈরি করব…যাদের দায়িত্ব হবে এই মানুষগুলোর দেখভাল করা। ইনশাআল্লাহ।”
রোববার রাজধানীর কৃষিবিদ ইন্সটিটিউটে আয়োজিত জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারম্যান কথা বলছিলেন।
সেখানে চব্বিশের যোদ্ধারাও ‘মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে গণ্য হবেন বলে মন্তব্য করেছেন তারেক রহমান। তার কথায় একাত্তরের অর্জিত স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব ‘রক্ষা হয়েছে চব্বিশের আন্দোলনে’।
তিনি বলেন, “কারণ তারাও (২৪‘র যোদ্ধারা) একজন মুক্তিযোদ্ধা। তারাও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আপনারা গণ্য। একাত্তর সালে এই দেশের মানুষ মুক্তিযোদ্ধারা এই দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য জীবন দিয়েছিলেন, এই দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যোদ্ধারা ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন।
“ঠিক একইভাবে ২৪‘র যোদ্ধারা যুদ্ধ করেছেন… তারা স্বাধীনতা সার্ব রক্ষার যুদ্ধ করেছেন। স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছিল একাত্তর সালে। তাকেই আবার রক্ষা করা হয়েছে ২০২৪ সালে। সেজন্যই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আমরা আপনাদের জন্য আরেকটি বিভাগ তৈরি করব।”
‘জুলাইয়ে গণহত্যা হয়েছে’
তারেক রহমান বলেন, “দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ফ্যাসিবাদী বিরোধী আন্দোলনে হাজার হাজার মানুষ গুম হয়েছে , খুন অপহরণের শিকার হয়েছে… এরকম অনেকগুলো পরিবারের সাথে গতকাল আমার কথা হয়েছে, দেখা হয়েছে। অসংখ্য অগণিত পরিবার সব হারিয়ে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। শুধুমাত্র জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও ১৪‘শও বেশি মানুষ শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন ত্রিশ হাজারের মতো মানুষ।
“এই ত্রিশ হাজার এর মত মানুষের মধ্যে এমন কিছু মানুষ আছেন যাদের সংখ্যা ৫‘শ মত। যাদের কারো এক চোখ অথবা কারো দুই চোখই নষ্ট হয়ে গিয়েছে, পঙ্গু হয়েছেন অনেকে। জুলাই অভ্যুত্থানে যেভাবে দেড় হাজারের মত মানুষকে যে হত্যা করা হয়েছে এটিকে এক বাক্যে স্রেফ আমরা একটি গণহত্যা বলতে পারি। জুলাই গণঅভ্যুথনে যারা বিভিন্নভাবে আহত হয়েছেন তাদের অনেকেই আজকের এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত আছেন। আমাদের সামনে বক্তব্য রেখেছেন কেউ কেউ। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী আহতদের যারা বক্তব্য রেখেছেন তাদের কষ্টের কথাগুলো আমরা শুনেছি।”
তিনি বলেন, ‘‘আপনাদের কারণেই আপনাদের সাহসী ভূমিকার কারণেই কারণেই ফ্যাসিবাদী চক্র শুধুমাত্র রাষ্ট্র ক্ষমতা নয় বরং এই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।
“২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট আমি আপনাদের ভূমিকার কথা স্মরণ করে একটি বক্তব্য রেখেছিলাম। সেই বক্তব্যে আমি বলেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শহীদ আবু সাঈদ, মাহফুজুর রহমান মুগধ, কলেজ ছাত্র ওয়াসিম আকরাম, মাদ্রাসা ছাত্র আব্দুল্লাহ আল মামুন, স্কুল ছাত্র রিফাত হোসেন, কুমিল্লার আইনজীবী আবুল কালাম, চুয়াডাগার রাজমিস্ত্রী উজ্জ্বল হোসেন, নোয়াখালীর দোকান কর্মচারী আসিফ, বরগুনার ওষুধ কোম্পানির সেলসম্যান আল আমিন, পাবনার গাড়িচালক আরাফাত হোসেন, মিরপুরের গুলিবিদ্ধ ২২ বছর বয়সী মুত্তাকিন, দোকান কর্মচারী আতিকুল, অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী তামিমের মতন অনেকের হাত কিংবা পা কেটে ফেলতে হয়েছে। হত্যা থেকে ছয় বছরের শিশু রিয়া গোপাও কিন্তু রেহাই পায়নি সেদিন।”
তারেক বলেছেন, এক বক্তব্যে হয়তো সবার নাম বলা সম্ভব নয়।
“এত মানুষ শহীদ হয়েছেন, এত মানুষ আহত হয়েছেন। ফ্যাসিবাদ শাসন শোষণের বিরুদ্ধে ২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে দল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের স্বাধীনতা প্রিয়, গণতান্ত্রকামী প্রত্যেকটি সেক্টরের প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষ সেদিন রাজপথে নেমে এসেছে। সেদিনকার ক্যামেরায় বন্দি যত ছবি উঠেছে প্রত্যেকটি ছবি এই কথারই সাক্ষ্য দেয়।”
এই অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারম্যানের সহধর্মিনী জুবাইদা রহমান অতিথি সারিতে শহীদ পরিবারের সাথে বসেছিলেন। শহীদ পরিবারের সদস্যরা তাদের কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লে পুরো অনুষ্ঠানস্থলের পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে।
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আগামী নির্বাচন ‘অত্যন্ত এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
একটি নিরাপদ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় আগামী সংসদ নির্বাচন ‘অত্যন্ত, অত্যন্ত এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
তিনি বলেন, “ফ্যাসিবাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে গণঅভ্যুত্থানে যারা শহীদ হয়েছেন, যারা হতাহত হয়েছেন তাদের উদ্দেশ্য কী ছিলো? তাদের উদ্দেশ্য ছিল একটি স্বনির্ভর, একটি নিরাপদ একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। একটি নিরাপদ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য আগামী জাতীয় নির্বাচন অত্যন্ত, অত্যন্ত এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ।”
তারেকে কথায়, একটি নিরাপদ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হলে আগামী দিনে সবাইকে এভাবেই শোক সমাবেশ আর শোক গাঁথা চলমান রাখতে হবে।
তিনি বলেন, “আর শোক গাঁথা বা শোক সমাবেশ নয়। বরং আসুন গণতন্ত্রকামী মানুষ আগামীর বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিজয়ের গাঁথা রচনা করবে ইনশাল্লাহ।”
আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনে রাষ্ট্র এবং বিএনপির দায়িত্বের কথা তুলে ধরেন তারেক।
তিনি বলেন, “দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদ বিরোধী ধারাবাহিক আন্দোলন এবং ২৪ সালে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে আহত এবং হতাহতের প্রতি রাষ্ট্রের অবশ্যই দায়িত্ব রয়েছে। একটি দায়িত্বশীল দল হিসেবে বিএনপি সেই দায়িত্ব অনুভব করে।
“জনগণের রায় বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে অবশ্যই পর্যায়ক্রমিকভাবে আমরা আমাদের সেই দায়িত্ব, সেই অঙ্গীকার, সেই প্রতিশ্রুতি আপনাদের সামনে এবং দেশের মানুষের সামনে ইনশাল্লাহ আমরা পুরণ করব।”

