যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যেই ইরান তাদের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছেলে মুজতাবা খামেনিকে নিয়োগ দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ওয়াশিংটন ও তেলআবিবকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে তেহরান— তারা যুদ্ধ থেকে পিছু হটবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগে থেকেই মুজতাবাকে নতুন নেতা হিসেবে ‘গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। সেই অবস্থানকে সরাসরি অগ্রাহ্য করেই ইরান এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মুজতাবাকে ক্ষমতায় বসানোর মাধ্যমে ইরানের শাসনব্যবস্থায় কট্টরপন্থিদের প্রভাব আরও শক্তিশালী হলো এবং সংস্কারপন্থি বা মধ্যপন্থিরা আরও কোণঠাসা হয়ে পড়ল।
মুজতাবা খামেনি দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। তাকে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার পদে নিয়োগ দেওয়া ইঙ্গিত করছে যে, ইরানকে নতিস্বীকার করাতে যুক্তরাষ্ট্রের যে চাপ ছিল তা এখনো সফল হয়নি।
আনুগত্য ঘোষণা সেনাবাহিনীর
নিয়োগের পরপরই আইআরজিসি ও ইরানি সেনাবাহিনী নতুন নেতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে তারা মুজতাবার নেতৃত্বে আরও শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেন,
“মুজতাবাকে ক্ষমতায় আনা আসলে একই পুরোনো কৌশলের পুনরাবৃত্তি।”
তিনি আরও বলেন, এত বড় সামরিক অভিযানের পর যদি শেষ পর্যন্ত একই ধারার আরও কট্টরপন্থি নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের কূটনৈতিক অস্বস্তির কারণ হতে পারে।
যুদ্ধ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, মুজতাবার নিয়োগ যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কমিয়ে দিয়েছে। বরং সংঘাত আরও তীব্র হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ইরানের শাসনব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতাই চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী। তিনি দেশের পররাষ্ট্রনীতি, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং সামরিক কৌশলসহ গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন।
কঠিন সময়ের মুখে ইরান
ইরানের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, জনগণের অসন্তোষ, অর্থনৈতিক সংকট এবং চলমান যুদ্ধ— সব মিলিয়ে মুজতাবা খামেনি ক্ষমতার শুরুতেই বড় চাপের মুখে পড়তে পারেন।
তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, তিনি দ্রুত নিজের ক্ষমতা সুসংহত করার চেষ্টা করবেন। এর ফলে আইআরজিসির প্রভাব আরও বাড়বে এবং অভ্যন্তরীণভাবে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও দমননীতির সম্ভাবনাও বাড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক পল সালেম বলেন,
“এটি একটি চরম মুহূর্তে নেওয়া চরমপন্থি সিদ্ধান্ত। এখন নতুন নেতৃত্বের পক্ষে আপসের পথ বেছে নেওয়া খুবই কঠিন।”
পশ্চিমাদের সঙ্গে আপসে অনাগ্রহ
৫৬ বছর বয়সী মুজতাবা খামেনি দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমাদের সঙ্গে সমঝোতার পক্ষে থাকা সংস্কারপন্থি রাজনীতিকদের বিরোধিতা করে আসছেন। বিশ্লেষকদের মতে, তার নেতৃত্বে ইরানের পররাষ্ট্রনীতি আরও কঠোর ও আক্রমণাত্মক হতে পারে।
মুজতাবা কোম শহরের ধর্মীয় সেমিনারিতে পড়াশোনা করেছেন এবং ‘হুজ্জাতুল ইসলাম’ উপাধি পেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ২০১৯ সালে তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।
আঞ্চলিক কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, মুজতাবার নিয়োগের মাধ্যমে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে— তারা কোনোভাবেই পিছু হটবে না এবং সংঘাতের শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে।
সূত্র: রয়টার্স, দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল

