ইরানের অভ্যন্তরে এক হাজারের বেশি নিশানায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক যৌথ সামরিক অভিযান বিশ্বজুড়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর হামলার আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।
ট্রাম্পের যুক্তি ও তথ্যের অসঙ্গতি
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলার সপক্ষে ‘প্রি-এম্পটিভ সেলফ ডিফেন্স’ বা আগাম আত্মরক্ষার যুক্তি দিয়েছেন। তার দাবি, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও মিত্রদের ওপর হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এছাড়া ইরান এক মাসের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারে বলেও তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
তবে সমালোচকরা বলছেন, ট্রাম্পের এই দাবির পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা প্রমাণ নেই। এমনকি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনের সঙ্গেও প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের অমিল পাওয়া গেছে। মজার ব্যাপার হলো, গত জুন মাসেই ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করে দেওয়া হয়েছে। তার আগের সেই বক্তব্যের সঙ্গে বর্তমানের এই ‘পারমাণবিক হুমকির’ দাবি সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সাংবিধানিক ক্ষমতা বনাম কংগ্রেসের এখতিয়ার
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হলেও যুদ্ধ ঘোষণার একক ক্ষমতা কেবল কংগ্রেসের। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হামলার মাধ্যমে ট্রাম্প তার সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এই অভিযানকে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ও নিখুঁত আকাশ অভিযান’ এবং একটি ‘যুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজল্যুশন (WPR)’-এর অধীনে কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া প্রেসিডেন্ট কোনো দেশকে সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে পারেন না। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসকে অবহিত করা শুরু করেছে, তবে এই অভিযান ৬০ দিনের বেশি চালাতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন বাধ্যতামূলক।
আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন?
জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী, কোনো সদস্য দেশ অন্য কোনো দেশের ওপর শক্তি প্রয়োগ করতে পারে না, যদি না সেটি আত্মরক্ষার জন্য হয় বা নিরাপত্তা পরিষদের অনুমতি থাকে। কানাডাসহ অনেক দেশই মনে করছে, এই সংঘাত আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।
• যুক্তরাজ্য ও স্পেন: সংঘাতের পর্যাপ্ত ন্যায্যতা না থাকায় দেশ দুটি তাদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারে যুক্তরাষ্ট্রকে সীমিত অনুমতি দিয়েছে।
• নিরাপত্তা পরিষদ: ভেটো ক্ষমতা থাকায় যুক্তরাষ্ট্র আইনি ব্যবস্থা থেকে বেঁচে গেলেও আন্তর্জাতিক মহলে তাদের গ্রহণযোগ্যতা সংকটে পড়তে পারে।
খামেনি হত্যাকাণ্ড: বিচারিক ও সামরিক বিতর্ক
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করার বিষয়টি আইনি জটিলতায় ঘেরা। ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের এক নির্বাহী আদেশে মার্কিন কর্মকর্তাদের কোনো পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডে (Assassination) অংশ নেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খামেনির মৃত্যু আইনি হবে কি না তা নির্ভর করছে দুটি বিষয়ের ওপর: ১. হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল কি না। ২. খামেনিকে সরাসরি সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে গণ্য করা যায় কি না।
বর্তমানে মার্কিন কংগ্রেসের উভয় দলের আইনপ্রণেতারা এই সামরিক অভিযান বন্ধে ভোটাভুটির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে ট্রাম্পের ‘ভেটো’ দেওয়ার ক্ষমতার কারণে এই আইনি প্রক্রিয়া কতটা সফল হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। শেষ পর্যন্ত জনমতই এই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

